আদানির ‘পিণ্ডি’ মোদির ঘাড়ে

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:৩০ এএম

ভারতীয় ধনকুবেরের গৌতম আদানির ঘুষকাণ্ড বর্তমানে দেশটির রাজনীতির সবচেয়ে আলোচ্যবিষয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ঘুষ ও প্রতারণা মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীটির প্রধান গৌতম আদানি ঘরে-বাইরে বেশ চাপে রয়েছেন। আদানি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। ফলে তার এই ঘুষকাণ্ড নিয়ে বিপাকে পড়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। বিদেশ বিভূইয়ে আদানির অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠার পর থেকেই আদানির বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছে ভারতের বিরোধী দলগুলোর জোট। এমনকি এই ইস্যুতে আলোচনার দাবিতে ভারতের লোকসভায় প্রস্তাবও তোলা হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীনরা এই বিষয়ে নীরব অবস্থান ধরে রাখায় ভারতের লোকসভার শীতকালীন অধিবেশন একরকম অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখে সংসদ অধিবেশন মুলতবি করতে হয়েছে। এবার দেশটির প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের নেতৃত্বে দেশটির সংসদের মূল প্রবেশপথ মকর দ্বারের সামনে প্রতিবাদ জানিয়েছে ইন্ডিয়া জোটভুক্ত বিরোধীদলগুলো। এ সময় আদানির বিরুদ্ধে যৌথ সংসদীয় কমিটির তদন্ত দাবি করে দলগুলো।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, গত মঙ্গলবারের মতো বুধবারও পার্লামেন্টের মূল প্রবেশপথ মকরদ্বারের সামনে আদানি ঘুষকাণ্ডে যৌথ সংসদীয় কমিটির তদন্ত চেয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে প্রতিবাদ জানিয়েছে ইন্ডিয়া মঞ্চ। এ সময় মোদি ও আদানি একই সত্তা বলেও সেøাগান দেন বিরোধী নেতারা। এই কর্মসূচিতে অংশ নেয় আদমি পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, উদ্ধবপন্থি শিবসেনা, ডিএমকেসহ বিরোধী জোটভুক্ত দলগুলো। কিন্তু এই জোটের অংশ হয়েও ভারতীয় পার্লামেন্টের প্রবেশদ্বারে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিবাদে অংশ নেয়নি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস।

মূলত পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশনের শুরু থেকেই আদানি নিয়ে সংসদ অচলের বিরোধিতা করেছে তৃণমূল। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের ডাকা বৈঠকেও হাজির থাকছে না তারা। মূলত আদানি ঘুষকাণ্ড নিয়ে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কংগ্রেস লোকসভা ও রাজ্যসভায় আলোচনার দাবি তুললেও তৃণমূলসহ বাকি বিরোধীদের পাশে পায়নি। আর তাই বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার মধ্যে বিভাজনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আর অচলাবস্থা কাটাতে বিরোধীদের মধ্যে এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়েছে মোদি সরকার।

তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেছেন, সংসদে বিজেপির কুকীর্তিকে প্রকাশ্যে আনার সার্বিক কৌশলের ক্ষেত্রে আমরা সবাই একজোট। তবে বিভিন্ন দলের সেই কৌশলকে বাস্তবায়িত করার বিভিন্ন উপায় থাকতেই পারে। কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করে বুধবার কংগ্রেসের গৌরব গগৈ তৃণমূলের লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করেছিলেন। তবে সুদীপ তাকে জানান, তৃণমূলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনাসহ সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছয়টি বিষয় নিয়েই তারা সরব হবেন। এমতাবস্থায় তৃণমূলের পক্ষে এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।

বুধবার বিকেলেই বুলেটিন প্রকাশ করে, মকরদ্বার অবরোধ করে কোনো কর্মসূচি পালন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে ভারতের স্পিকারের কার্যালয় থেকে। এর ফলে সংসদের প্রাত্যহিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাও বিঘিœত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্পিকার ওম বিড়লা জানিয়েছেন, নারী সংসদ সদস্যরা তার কাছে এ বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। কংগ্রেস অবশ্য পার্লামেন্টের ভেতরেই এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিল। তবে বাকি বিরোধী দলগুলোর সায় না থাকায় মূল প্রবেশপথে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে বিরোধীদের প্রতিবাদের মুখেও আদানি নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি মোদি সরকার। গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনা বলে দাবি করে তা নিয়ে আলোচনায় রাজি হয়নি বিজেপি। এদিকে, প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করলেও শিল্পগোষ্ঠীটির ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে বিশ্ব জুড়ে কয়েক হাজার কোটি ডলার বাজার মূল্য খুইয়েছে আদানি গোষ্ঠীর অধীনস্থ সংস্থাগুলো। গোষ্ঠীটির সঙ্গে বড় অঙ্কের দুটি চুক্তি বাতিল করেছে কেনিয়া। এমনকি আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি পুনর্বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত গোষ্ঠীটির সঙ্গে নিজেদের সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে ফ্রান্সভিত্তিক জ¦ালানি খাতের জায়ান্ট টোটাল এনার্জি। অর্থনীতি ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ অভিযোগ আদানি গোষ্ঠীর পাশাপাশি ভারতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আদানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতিতে কতটা পড়তে পারে সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় অবকাঠামো ব্যবসায়ী গৌতম আদানির সঙ্গে ভারতের অর্থনীতির গভীর সংযোগ রয়েছে। দেশটির ১৩টি বন্দর, সাতটি বিমানবন্দর পরিচালনা করে আদানি গোষ্ঠী। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিমেন্টের ব্যবসার এই শিল্পগোষ্ঠীর। ৬টি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী আদানি গ্রুপ, ভারতের এনার্জি সেক্টরের বৃহত্তম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। একইসঙ্গে ভারতে গ্রিন হাইড্রোজেনের খাতে ৫০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আদানি। দেশটিতে আট হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনও পরিচালনা করে আদানি গোষ্ঠী। প্রসঙ্গত, নরেন্দ্র মোদি এবং গৌতম আদানি দুজনেরই আদিনিবাস গুজরাট। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন থাকার পর থেকেই মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে আদানির। পরে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আদানিকে নিজের ঘনিষ্ঠজন বলে আখ্যা দিয়েছেন মোদি নিজেও। ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আদানি এবং মোদি দীর্ঘদিন ধরেই অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে গত এক দশকে ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আদানির বিস্তর প্রভাব রয়েছে। আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালে গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে স্টক ম্যানিপুলেশন এবং জালিয়াতির অভিযোগ তোলে। যুক্তরাষ্ট্রে থিংক-ট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ভারত এবং বিশ্বে আদানি তার ভাবমূর্তি নিয়ে সংকটে পড়েছেন। এই মুহূর্তে তিনি সেটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন। দেখাতে চাইছেন যে, হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের তোলা জালিয়াতির অভিযোগুলো সত্যি ছিল না। তবে এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযুক্ত হওয়ায় আদানিকে সে কৌশলে বদল আনতে হবে বলে মনে করছেন কুগেলম্যান। তবে আপাতত ভারত থেকে মূলধন সংগ্রহ করার বিষয়ে গৌতম আদানির প্রকল্পগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলেও জানান তিনি।

সিঙ্গাপুরের লি কং চিয়ান ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি প্রফেসর নির্মাল্য কুমার বলছেন, ভারতের সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া কোনো নতুন খবর নয়। কিন্তু যে পরিমাণ অর্থের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি বিস্ময়কর। তিনি বলেছেন, ঘুষের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বন্ধ করবে। সেই সঙ্গে ভারতের রাজনীতির ময়দানে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ প্রতিধ্বনিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। ফলে আদানির সঙ্গে বিপাকে পড়তে পারেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। এজন্য দুজনের ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদির নীতিগত অগ্রাধিকারগুলো আদানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে মুদ্রার উল্টোপিঠ নিয়েও আলোকপাত করেছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের সবশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে অভিহিত করে থাকেন তিনি। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর আদানির বিরুদ্ধে মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এটি সহজেই অনুমান করা যায় যে আদানির গোষ্ঠী শীর্ষ স্তরের আইনি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায় যে আদানির ঘুষকাণ্ড ভারতে তার নিজের এবং মোদির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীরা একাট্টা হওয়ায় সে শঙ্কা একেবারে উড়িয়েও দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। এখন দেখার অপেক্ষা এই চ্যালেঞ্জ উতরে আদানি-মোদি নিজেদের যাত্রা মসৃণ রাখতে পারেন কি না! অন্যথায় আদানির পিণ্ডি মোদির ঘাড়ে উঠলে সেটি অনুমতিভাবেই প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন এক রাজনৈতিক সংকটসৃষ্টি করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত