শায়খ আহমদুল্লাহ একাধারে বিদগ্ধ আলেম, লেখক, গবেষক, ইসলামি আইনজ্ঞ, সমাজসেবক ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। মানবিক কাজে সর্বাগ্রে দেখা যায় তাকে। দ্বীনি দাওয়াত ও সমাজসেবায় তিনি নিজেকে ব্রত রেখেছেন কর্মজীবনের শুরু থেকেই। নিকট অতীতের প্রত্যেকটি বন্যায় বানভাসি মানুষের প্রতি সহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসনে তার অবদান অনস্বীকার্য। নিজের সব কাজ উপেক্ষা করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায়। স্মরণকালের প্রলয়ঙ্করী প্রত্যেকটি বন্যায় তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতায় সব সময় তিনি সরব থাকেন। খাদ্য সরবরাহ, পানিবন্দিদের উদ্ধারসহ বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, সব কিছুতেই রয়েছে তার অসামান্য অবদান। তার প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থা আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার বেশি ত্রাণ নিয়ে সর্বশেষ বন্যায় তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবসেবী এই আলেম মনে করেন, মানুষ মানুষের জন্য। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে মানুষের জন্য কাজ করার প্রচণ্ড স্পৃহা ছিল। মিরপুর থাকাকালেও তিনি বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
এছাড়াও তিনি দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার হার কমিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গরু-বাছুর, ছাগল, রিকশা, সেলাই মেশিনসহ আরও অনেকভাবে মানুষের কর্মের ব্যবস্থা করাই হচ্ছে তার নিত্যদিনের ব্যস্ততা। আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আধুনিক কর্মসংস্থান উপহার দিয়ে যাচ্ছেন দেশবাসীকে। আলেম সমাজের মধ্যে রয়েছে তার বেশ গ্রহণযোগ্যতা। বয়োজ্যেষ্ঠ সব আলেমের কাছে তিনি স্নেহের পাত্র। সমসাময়িক সবার কাছে তিনি শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। যেন তিনি আলেম সমাজের ফুটন্ত গোলাপ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও রয়েছে তার বেশ গ্রহণযোগ্যতা। উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আরব-অনারব সর্বত্রই তিনি সমাদৃত। বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের কাছে রয়েছে তার যথেষ্ট কদর। ইতিমধ্যেই তিনি এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দ্বীনের দাওয়াতি কাজে সফর করেছেন। অতিথি হয়েছেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনারে। কর্মঠ এই আলেম বিশ্ব দরবারে বারবার নিজের দেশের মান-মর্যাদা উজ্জ্বল করেছেন। ঈর্ষণীয় হয়ে উঠছেন সবার কাছে। অগ্রজ, অনুজ সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
ওয়াজ ও বক্তৃতার মাঠেও তিনি সক্রিয় রয়েছেন। দেশের আনাচে-কানাচে দাওয়াতের লক্ষ্যে সভা, সেমিনার ও মাহফিল করে যাচ্ছেন এই দাঈ আলেম। লেখালেখি ও সাহিত্য অঙ্গনেও তিনি পিছিয়ে নেই। এ যাবৎ তার বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রত্যেকটি বই পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছে। এছাড়া তিনি বাংলা ও আরবি ভাষায় দাওয়াহ ও গবেষণামূলক শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। দেশীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রায়ই তার লেখা প্রকাশিত হয়ে থাকে। মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠ সমস্যার সমাধানও দিয়ে থাকেন তিনি। শরিয়তের যেকোনো সমস্যার সমাধান পেতে মানুষ অনলাইনে শায়খ আহমদুল্লাহর প্রশ্নোত্তরপর্ব অনুষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। নিজেদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তরও পান তারা।
শায়খ আহমদুল্লাহ ১৯৮১ সালের ১৫ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরের বশিকপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন একজন দ্বীনদার মানুষ। দাওয়াত ও তাবলিগের সাথী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তিন পুত্র ও এক কন্যার জনক তিনি। দ্বীনি পরিবারেই তার বেড়ে ওঠা। নিজ মা-বাবা ও চাচার কাছেই বাল্যশিক্ষা অর্জন করেন। গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যাত্রা শুরু করেন। নোয়াখালীর হরিনারায়ণপুর মাদ্রাসায় নুরানি বিভাগের শিক্ষালাভ করেন। লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানাধীন বোয়ালিয়া কওমি মাদ্রাসায় উর্দু ভাষা শেখেন। এরপর নোয়াখালী হাতিয়ার ফয়জুল উলুম কওমি মাদ্রাসায় আরবি ব্যাকরণের শিক্ষা অর্জন করেন। এখানে তিনি মুফতি ফয়জুল্লাহ (রহ.)-এর শাগরেদ মুফতি সাইফুল ইসলাম (রহ.)-এর শিষ্যত্ব লাভ করেন। এরপর তিনি দেশের সর্ববৃহৎ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে সেখানে কয়েক বছর পড়াশোনা করেন। অতঃপর যশোর দড়াটানা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের অধীনে শরহে বেকায়া জামাতে (উচ্চমাধ্যমিক) সারা দেশের সম্মিলিত মেধাতালিকায় দশম স্থান, মিশকাত জামাতে (স্নাতক) তৃতীয় স্থান এবং ২০০১ সালে দাওরায়ে হাদিসে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। দাওরায়ে হাদিস শেষ করে খুলনা দারুল উলুম থেকে ইফতা (উচ্চতর ইসলামি আইন) সম্পন্ন করেন।
লেখাপড়া শেষে শিক্ষকতার মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা হয়। তার প্রথম কর্মস্থল ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিরপুর দারুর রাশাদ মাদ্রাসা। ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এ মাদ্রাসায় কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন মিরপুরের বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদে। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। ডাক আসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব থেকে। আরবি ভাষায় বিশেষ দক্ষতার কারণে আরব দাঈদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। সৌদি আরবের পশ্চিম দাম্মাম ইসলামিক দাওয়াহ সেন্টারে যোগ দেন। একজন দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে সেখানে দীর্ঘ দশ বছর কাজ করেন। তখন তিনি দেশি-বিদেশি সবার আস্থা অর্জন করেন। ২০১৭ সালে দেশে ফিরে এসে দেশবাসীর কল্যাণে কাজ শুরু করেন। নিজেকে মানবসেবায় নিয়োজিত রাখতে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন নামক দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠাতা করেন।
বর্তমানে তিনি আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ভূমি পল্লী জামে মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে জাকাতের অর্থে স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্প, সবার জন্য কুরবানি, বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, এতিমদের লালন-পালন ও শিক্ষাদান, সদকায়ে জারিয়া, শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ইফতার ও রমজান ফুড বিতরণ, সাপ্তাহিক দরস, বই-পুস্তক বিতরণ, মজলিসুস সুন্নাহ, ইসলাম প্রচার প্রভৃতি। এছাড়াও ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছেন। ঢাকার আফতাবনগরে রয়েছে তার বিশাল কর্মপরিধি। এছাড়াও তিনি দ্বীনি দাওয়াত নিয়ে চষে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। উম্মাহর এই নিরলস খাদেমকে আল্লাহ কবুল করুন। দীর্ঘজীবী করুন। আমিন।
