কোরআনে যাদের সফল বলা হয়েছে

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০৪ এএম

সৎকাজের আদেশ বলতে সাধারণত কাউকে ন্যায় ও ভালো কাজের নির্দেশ দান করা বোঝায়। আর অসৎকাজের নিষেধ হলো যাবতীয় মন্দ ও খারাপ কাজ থেকে কাউকে বিরত রাখা। সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ একটি কল্যাণকর কাজ। যারা এ কাজ করে কোরআনে তাদের সফল বলা হয়েছে। আমরা অনেক সময় মানুষের সমালোচনার ভয়ে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকি। কিন্তু কেয়ামতের দিন এজন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দাকে প্রশ্ন করবেন এবং এ কথাও জিজ্ঞেস করবেন, দুনিয়ায় মন্দ কাজ দেখা সত্ত্বেও কোন জিনিস তোমাকে তার বিরোধিতা করা থেকে বিরত রেখেছিল? তখন সে বলবে, হে রব! আমি আপনার ওপর ভরসা করেছিলাম এবং মানুষের প্রতি ভীত ছিলাম। তখন আল্লাহ বলবেন, আমাকেও তোমার ভয় করা উচিত ছিল।’ (ইবনে মাজাহ ৪০০৮)

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার জন্য মুসলমানদের ভেতর থেকে একটি দলকে প্রাথমিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর এসব লোকই হবে সফলকাম।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৪) এ আয়াতে আদেশসূচক বাক্য ব্যবহৃত হওয়ায় বোঝা যায়, এ কাজটি ওয়াজিব।

সৎকাজের আদেশ নিজ পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। আল্লাহতায়ালার আদেশও অনুরূপ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যেটার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে রূঢ় স্বভাব ও কঠিন হৃদয়ের ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে, যারা কখনো আল্লাহর কোনো নির্দেশ অমান্য করে না। তাদের যে নির্দেশ দেওয়া হয় তাই পালন করে।’ (সুরা তাহরিম ৬) এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পিতা-মাতা বা পরিবারপ্রধানের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা। অতঃপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে তার পরিবার-পরিজনকেও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা।

সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজের নিষেধ করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এ কাজ দুটি খুবই কঠিন। তবে আল্লাহতায়ালা যাকে চান, তার জন্য সহজ করে দেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করবেন, যে আল্লাহর সাহায্য করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী শক্তিধর। তারা এমন লোক যাদের আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা নামাজ আদায় করবে, জাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর আয়ত্তে।’ (সুরা হজ ৪০-৪১)

একজন মুমিন নিজে সৎকাজে প্রতিষ্ঠিত থেকে অন্যকে অনুপ্রেরণা জোগাতে থাকবে। সে সৎকাজের প্রসারতা দানে যথাসাধ্য সময় ও সম্পদ ব্যয় করে যাবে। উদ্দেশ্য থাকবে যেন মানুষ সৎকাজ করে প্রকৃত মুমিন হতে পারে। অসৎকাজ থেকে নিজে বাঁচতে এবং অপরকে বাঁচাতে একজন মুমিন আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, যাতে সমাজে তা সংঘটিত না হয়। মুমিন পুরুষ ও নারী পরস্পরের বন্ধু। অতএব এক বন্ধু অপর বন্ধুর জন্য কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছু কামনা করতে পারে না। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে। নামাজ আদায় করে, জাকাত দেয় এবং তারা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে। তারা এমন মানুষ, যাদের ওপর আল্লাহ অবশ্যই দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তওবা ৭১) আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা কোরো না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা কঠোর শাস্তিদাতা।’

(সুরা মায়েদা ২)

এ আয়াতের তাফসিরে আলেমরা বলেছেন, সমাজে এমন কিছু লোক থাকা দরকার, যারা সমাজের কোথাও খারাপ কাজ হচ্ছে কি না, তা লক্ষ রাখবে এবং তাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। এ আয়াতের শিক্ষা হলো, প্রকৃত মুমিনকে শুধু নিজের মুক্তির কথা চিন্তা করলে হবে না, বরং সমাজের অন্য সদস্যদের মুক্তি এবং তাদের উন্নতির জন্যও চেষ্টা করতে হবে। এটি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। এর ওপর সমাজের কল্যাণ ও সৌভাগ্য নির্ভরশীল।

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করার ক্ষেত্রে নম্রতা বজায় রাখা একান্ত আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নরম কথা বলবে। হয়তো-বা সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা তাহা ৪৪) রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে বস্তুর মধ্যে নম্রতা ও কোমলতা থাকে, সেটার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। আর যে বস্তুর মধ্যে কঠোরতা থাকে তা অসুন্দর হয়।’(সহিহ মুসলিম ৬৭৬৭) নম্রতার মাধ্যমে চমৎকার ফলাফল ও সুন্দর পরিণতি লাভ হয়। পক্ষান্তরে কঠোরতা ও রূঢ় আচরণের কারণে কাক্সিক্ষত বিষয় নষ্ট হয়ে যায়। রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহতায়ালা নিজে নম্র। সব বিষয়ে তিনি নম্রতা পছন্দ করেন। আর তিনি নম্রতার জন্য যা দান করেন, কঠোরতা বা অন্য কোনো কিছুর জন্য তা দান করেন না।’ (সহিহ মুসলিম ৬৭৬৬)

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধে ধৈর্যধারণ ও সহনশীল থাকতে হবে। কারণ এ রাস্তায় অনেক কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে। এক্ষেত্রে যদি ধৈর্য ও সহনশীলতায় অটল থাকা না যায়, তাহলে লোকদের সংশোধন তো হবেই না; বরং উল্টো ফ্যাসাদ সৃষ্টি হবে। যেমন হজরত লোকমান (আ.) তার পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে বৎস! নামাজ আদায় করো, সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ  থেকে নিষেধ করো। আর বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয়ই এটি আবশ্যকীয় একটি কাজ।’ (সুরা লোকমান ১৭) উল্লেখ্য, আপনার আদেশ যেন সৎকাজের জন্য হয় এবং অসৎকাজে আপনার নিষেধ করাও যেন সৎ হয়। আরেকটি নিয়ম হচ্ছে, দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে ফেলা, যাতে ভয় এবং মানুষের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা না থাকে। কেননা যে ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে পাওয়ার আশা ছিন্ন করবে না, সে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে সক্ষম হবে না।

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধের মধ্যে অনেক কষ্ট ও পরীক্ষা হয়, যার ফলে মানুষ অনেক ফেতনার শিকার হয়। তাই একদল মানুষ সব সময় ফেতনার বাহানায় সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ হিসেবে বলেন, এভাবেই আমি ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকব। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের মধ্যে এমন লোক আছে যে বলে, আমাকে অব্যাহতি দাও এবং আমাকে ফেতনায় ফেলো না। সাবধান! তারাই ফেতনায় পড়ে আছে।’ (সুরা তওবা ৪৯)

আমাদের প্রত্যেকটি সৎকাজ মানবজাতির কল্যাণ ও সুখের এবং প্রত্যেকটি মন্দকাজ মানবজাতির অকল্যাণ ও অশান্তির উৎস। সৎকাজ বাস্তবায়ন ও অসৎকাজ বর্জন মানুষকে সৎ মানুষ হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং সৎ মানুষ মানুষের কল্যাণ ও আনন্দের উৎস হয়। পক্ষান্তরে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চর্চায় বা বর্জন না করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অসৎ মানুষে পরিণত করে এবং তারা পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবনে মানবজাতির অকল্যাণ ও অশান্তির উৎস হয়।

অতএব মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা মুমিন বান্দার জন্য একান্ত আবশ্যক। আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহর সবাইকে এ কাজ করার তওফিক দান করুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত