ফ্রিল্যান্সিংয়ে যেসব বিষয়ে সতর্কতা কাম্য

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:০৩ এএম

বর্তমান এই ডিজিটাল সময়ে ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া একটু কঠিনই হবে। ফ্রিল্যান্সিং বলতে বোঝায় মূলত মুক্ত পেশাকে। যেখানে কাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সময়ের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ব্যক্তি তার নিজ দক্ষতা দিয়ে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি কে কাজে লাগিয়ে দেশে-বিদেশে যে সেবা দিয়ে থাকে সেটাকেই ফ্রিল্যান্সিং বলে। আর যে ফ্রিল্যান্সিং করে তাকে বলা হয় ফ্রিল্যান্সার। সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ফ্রিল্যান্সিংয়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। একটি সূত্রমতে, এ দেশের প্রায় ১০ লাখ তরুণ-তরুণী এই মুক্ত পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু মুসলিম প্রধান দেশ হলেও এ দেশের অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সারের জানা নেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়ে ইসলামের কী দিকনির্দেশনা রয়েছে বা এই পেশায় হারাম দিকগুলো কী কী?

ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজের পরিধি : ফ্রিল্যান্সিং জগতে কাজের পরিধি অনেক ব্যাপক। তবে যে সব ক্যাটাগরিতে বেশি কাজ করা হয়ে থাকে সেগুলো হলো গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা এন্ট্রি, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইত্যাদি।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে ইসলামি নীতিমালা : একজন ফ্রিল্যান্সার যে ক্যাটাগরিতেই কাজ করুক না কেন তার জন্য ইসলাম কিছু সুনির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। যেগুলো পরিত্যাগের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার হালালভাবে তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। ফ্রিল্যান্সিংয়ে হারাম দিকগুলো তুলে ধরা হলো।

মূল কাজটি হালাল না হওয়া : যদি কেউ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ফ্রিল্যান্সিং করে যাদের উৎপাদিত পণ্য বা কাজকে ইসলাম মূলগতভাবে হারাম করেছে, তাহলে সে উপার্জন হালাল হবে না। যেমন কেউ এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ডেটা এন্ট্রি করল যারা মদ উৎপাদন করে, তাহলে তা হারামের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নেক ও তাকওয়ামূলক কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো। তবে পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়েদা ০২)

ধোঁকা দেওয়া : ধোঁকাবাজি বা প্রতারণার বিষয়টি ফ্রিল্যান্সিংয়ের জগতেও রয়েছে। যা অন্যতম একটি হারাম কাজ। টাকা নিয়ে অর্ডার ডেলিভারি না দেওয়া বা সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন না করেই ক্লায়েন্টকে তা জমা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ প্রতারণার বহু নজির ফ্রিল্যান্সিংয়ে রয়েছে। যা সম্পূর্ণরূপে হারাম। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়।’ (সহিহ মুসলিম ১০২)

কপিরাইট লঙ্ঘন করা : অন্যের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অনুমতি ছাড়া নিজে ব্যবহার করে ফায়দা হাসিল করাকে বলা হয় কপিরাইট লঙ্ঘন। যা অন্যের অধিকার খর্ব করার শামিল। আর এটি ইসলামে হারাম। যেমন অন্য কারও করা ডিজাইন নিজের বলে দাবি করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পদ গ্রাস করো না। তবে পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তা বৈধ।’ (সুরা নিসা ২৯)

অশ্লীলতা ছড়ানো : অশ্লীলতা প্রকাশ পায় এমন যেকোনো ধরনের ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, ডিজাইন, লোগো কিংবা মার্কেটিং নিষিদ্ধ। যেমন পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য কিংবা নাটক-সিনেমার থাম্বনেইল বা পোস্টার ডিজাইন করার ক্ষেত্রে পর্দাহীন নারীর ছবিযুক্ত করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।’ (সুরা নুর ১৯)

ক্ষতিকর কাজ করা : কেউ ব্যক্তি স্বার্থে ফ্রিল্যান্সিংয়ে এমন কোনো সার্ভিস দিল, যা অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়, তবে তা হারাম হবে। যেমন টাকার বিনিময়ে কারও জন্য ফিশিং লিংক তৈরি করে দেওয়া। ফিশিং বলতে প্রতারণার মাধ্যমে কারও কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ব্যবহারকারী নাম ও পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। প্রতারকেরা এই পদ্ধতিতে কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত ওয়েবসাইট সেজে মানুষের কাছ থেকে তথ্য চুরি করে থাকে। রাসুল (সা.) উম্মাহকে সতর্ক করে বলেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সেই, যার মুখ ও হাত হতে মুসলিমরা নিরাপদে থাকে।’ (সহিহ বুখারি ৯)

ওয়াদা ভঙ্গ করা : অনিবার্য কারণ ছাড়া ক্লায়েন্টকে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর অর্ডার সাবমিট না করা, ক্লায়েন্টকে দেখানো কাজের স্যাম্পলের সঙ্গে নিজের করা কাজের মিল না থাকা ইত্যাদি ওয়াদা ভঙ্গের নামান্তর। আর একজন মুসলিম কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা তোমাদের ওয়াদাগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা ১) আর প্রকৃত মুনাফিকের চারটি স্বভাবের মধ্যে একটি হলো ওয়াদা দিয়ে তা ভঙ্গ করা। (সহিহ বুখারি ২৯৫৪)

মুসলিম ফ্রিল্যান্সার ভাই-বোনদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, আপনারা হারাম থেকে দূরে থাকুন। হালালভাবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুন। কারণ হারাম উপার্জনে গঠিত শরীর জান্নাতে যাবে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হারাম দ্বারা পুষ্ট দেহ জান্নাতে যেতে পারবে না।’ (শুআবুল ইমান ৫৭৫৯) বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য হালাল উপার্জনের বিষয়ে অধিক সর্তক থাকা কাম্য। কেননা এখন হালালের সঙ্গে এত সূক্ষ্মভাবে হারাম মিশে যাচ্ছে যে, অধিক সতর্ক না হলে তা থেকে বেঁচে থাকা কঠিন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের সম্মুখে এমন এক যুগ আসবে, কেউ পরওয়া করবে না যে, সে কী উপায়ে সম্পদ লাভ করল, হালাল না হারাম উপায়ে।’ (সহিহ বুখারি ১৯৩১)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত