আশির দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ফিরোজা খন্দকার টিনা, যার নামেই বাংলাদেশে প্রথম সিনেমা নির্মিত হয় ‘প্রিন্সেস টিনা খান’। এই সিনেমার পর থেকে তিনি টিনা খান নামেই পরিচিতি পান। ১৯৮৫ সালে মুক্তির পর ১৬টি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় সিনেমাটি। এর মুক্তির চার বছরের মাথায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় টিনা খানের। সিনেমাটির জন্য তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মরণোত্তর পুরস্কার পান তিনি। মৃত্যুর সময় তার একমাত্র মেয়ে রিমু রোজা খন্দকারের বয়স ছিল মাত্র সাড়ে ৫ বছর। মাকে হারিয়ে একাকীই কাটে তার শৈশব, কৈশোর এবং তার পরের সময়টাও। হতে চেয়েছিলেন বিমানবালা কিন্তু নাম লেখান অভিনয়ে। ২০০৮ সালে শোবিজে যুক্ত হন এবং অভিনয়ে নিয়মিত হন।
শুরুটা নায়িকা হিসেবে হলেও এখন তিনি চরিত্রাভিনেত্রী। দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন দুই শতাধিক নাটকে এবং দশটির মতো চলচ্চিত্রে। কিন্তু বেশ অনেক বছর ধরেই সময়টা ভালো যাচ্ছে না তার। ঠিকঠাক কাজ পাচ্ছেন না। যেহেতু অভিনয় ছাড়া তার কোনো পেশা নেই, তাই এটাই তার একমাত্র উপার্জনের উৎস।
তার ভাষ্যে, আমি তো অভিনয় ছাড়া আর কিছু পারি না। অনেকটা দিন এই মাধ্যমের সঙ্গে রয়েছি। এটা ছাড়ার কথাও তো ভাবতে পারি না। তবে কখনো এমনটাও ভাবিনি, এ রকম সময় পার করতে হবে আমার। আমার অভিনয়ের শুরুটা কিন্তু নাটক দিয়েই হয়েছিল, তাও নায়িকা হিসেবে। প্রথম নাটকে আমার বিপরীতে ছিল অপূর্ব। সময়ের বিবর্তনে আমি এখন ক্যারেক্টার আর্টিস্ট। এটা নিয়েও আমার কোনো আপত্তি নেই কিন্তু সেই অর্থে কাজই পাচ্ছি না আমি। আর যে কাজগুলো করি, একজন চরিত্রাভিনেত্রীর পারিশ্রমিক খুবই অল্প এবং সেটা পেতেও আমাদের অনেক বেগ পোহাতে হয়।
রিমু রোজা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকেই যেখানে সারা মাস কাজ করছেন, সেখানে আমার কোনো কাজ নেই। এটাই আমার একমাত্র রুটি-রুজির জায়গা। এমনও অনেক সময় গেছে যে আমার কোনো কাজ নেই, উপার্জন নেই, তাই আমাকে না খেয়েও থাকতে হয়েছে করোনার সময়। আমি কখনো কোনো দিন কাউকে বলিনি, আমি খেতে পারছি না, আমাকে সাহায্য করো। আমি কাজ চেয়েছি কিন্তু পাইনি। এ রকম অনেক খারাপ সময় পার করেছি। এখনো যখন কাজ না আসে, মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার সময় বুঝি ফুরিয়ে এলো, চাহিদা বুঝি কমে গেল। এই মাসে মাত্র দুটি কাজ করেছি। আর কোনো কাজ নেই আমার হাতে।’
কয়েক বছরের ব্যবধানে নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী, নিজের সংগ্রামের লড়াইটা নিজেই করছেন। তবে এর জন্য কাউকে দোষারূপও করছেন না তিনি। তার কথা, মাকে হারানোর পর আমি আমার নানুর পরিবারে বড় হয়েছি। বাবার সাপোর্ট পাইনি। এরপর বাবাকেও হারালাম। বলতে পারেন, আমার লড়াইটা আমার একার। বাবা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন তার চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে আমি হিমশিম খেয়ে গিয়েছিলাম। এরপর আমি অসুস্থ হলাম, অনেক দিন হাসপাতালে ছিলাম। আমার কাছে তো অনেক টাকা নেই যে এগুলোর ব্যয়ভার বহন করতে পারব। তারপরও করেছি। সে সময় যাদের কাছে কাজের টাকা পেতাম, তাদের অনেক অনুরোধ করেছি সেগুলো দিয়ে দিতে। কিন্তু তারা দেয়নি। আমি কতটা কষ্টের মধ্য দিয়ে একা নিজে বাঁচার সংগ্রাম করে যাচ্ছি, সেটা শুধু আমি জানি।
যোগ করে রিমু আরও বলেন, ‘অনেক ভালো ভালো পরিচালক রয়েছেন যাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই, কিন্তু কেন জানি হচ্ছে না। তাদের রিচ করতে পারি না কিংবা তারা আমাকে কখনো ডাকেন না। তা ছাড়া অনেক সময় এমনও হয়েছে, আমাকে চূড়ান্ত করে আগের দিনও সেই কাস্টিং পরিবর্তন হয়ে যায়। তা ছাড়া যে কয়েকটা কাজই করি, সেগুলোর পারিশ্রমিকের জন্য পরিচালকদের বারবার তাগাদা দিতে হয়। অথচ নায়ক-নায়িকা অর্থাৎ হিরো-হিরোইনদের পারিশ্রমিক শুটিংয়ের আগে কিংবা অন স্পট দিয়ে দেওয়া হয়। তাদের পারিশ্রমিক তো অনেক, সেখানে আমার তো নামে মাত্র কিছু টাকা; সেটা নিয়ে আমাদের অনেক ভুগতে হয়। যখন খারাপ সময় পার করি, তখন তো কেউ খোঁজও নেয় না। তবে হ্যাঁ, হাতেগোনা কয়েকজন আমার খোঁজখবর নিয়েছিল বা নেয়। আমার জীবনটা অনেক ভুলে ভুলে কেটেছে। কেউ পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকেনি আমার। বেঁচে থাকতে হলে আমাকে অভিনয় করতে হবে। আমি কারও কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য চাইনি, শুধু কাজ করতে চেয়েছি। এগুলো ভাবতে ভাবতে মাঝেমধ্যেই আমার এংজাইটি অ্যাটাক হয়, অসুস্থ হয়ে পড়ি। ডিপ্রেশনে চলে যাই আমি। আমি অসুস্থ হলেও দেখার কেউ নেই। এভাবে কত দিন চলা যায়। আমি জানি না, সামনে আসলে কী হবে!’
