লাভের পুরোটাই ইসরায়েলের!

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:২৬ এএম

সিরিয়ায় আসাদ পরিবার এখন ইতিহাস। গত ৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। বিদ্রোহীদের মাত্র দুই সপ্তাহের কম ব্যবধানে চালানো ঝটিকা অভিযানে পতন ঘটেছে বাশার আল আসাদের দীর্ঘ ২৪ বছরের শাসনকাল। সেখানে গঠিত হয়েছে বিদ্রোহীদের অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ক্ষমতা দখল করলেও যে সিরিয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন নতুন সরকারের হাতে নেই সেটি স্পষ্ট। আরব বসন্তের পর তীব্র গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়া দেশটিতে গত ১৩ বছরে বাশার আল আসাদ সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে কাজ করেছে বেশ কয়েকটি দেশ ও গোষ্ঠী। সিরিয়ার দ্বন্দ্বে বাশারকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দিয়ে আসছিল ইরান ও রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের ইরানের মদদপুষ্ট ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর ভালো সম্পর্ক ছিল আসাদ পরিবারের সঙ্গে। ইসরায়েলবিরোধী এ গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র-রসদ সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম ছিল সিরিয়া। কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়াও হিজবুল্লাহ, হামাসের মতো সংগঠনগুলো এখন ওই পথে আর অস্ত্র আনতে পারছে না; যা আখেরে ইসরায়েলকে লাভবান করেছে। এছাড়া সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবং সমন্বয়হীনতার কারণে গোলান মালভূমিও হাতছাড়া হচ্ছে তাদের। সম্প্রতি ইসরায়েল মালভূমির অনেকটা অংশই নিজেদের দখলে নিয়েছে। সেখানে বসতি স্থাপন দ্বিগুণ করারও ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।  শুধু ঘোষণাই না, গত রবিবার গোলান মালভূমিতে বসতি সম্প্রসারণ উৎসাহিত করতে একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ইসরায়েল সরকার।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। কারণ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের সীমান্তে একটি ‘নতুন ফ্রন্ট’ খুলে গেছে।

গোলান মালভূমিতে জনসংখ্যা দ্বিগুণ করতে চান বলেও জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েল গোলান মালভূমি দখল করেছিল। সেটি নিয়ে ১৯৭৪ সালে সিরিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল, বিদ্রোহীদের হাতে দেশটির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার কারণে তা ‘ভেঙে পড়েছে’ বলে যুক্তি দেখিয়ে গোলানের বাফার জোনে ঢোকে ইসরায়েলি বাহিনী।

গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের ৩০টির বেশি বসতি রয়েছে। সেখানে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষের বাস। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ বসতি অবৈধ। তবে ইসরায়েল তা মানে না। নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল ওই অঞ্চলের দখল ধরে রাখবে, এলাকাটিকে সমৃদ্ধ করবে এবং স্থিতিশীল রাখবে।

নেতানিয়াহুর বসতির দখল ধরে রাখা নিয়ে বক্তব্যের কয়েক দিন আগে সিরিয়ার ডি-ফ্যাক্টো নেতা আহমেদ আল-শারা ওরফে আবু মোহাম্মদ আল জোলানি তার দেশের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

তিনি বলেন, এসব হামলা চালিয়ে ইসরায়েল সীমা অতিক্রম করছে এবং অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এদিকে বাশার আল আসাদের পতনের পর সিরিয়া হয়ে অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাশেম। শনিবার প্রথম জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন নাঈম কাশেম। তিনি বলেন, হ্যাঁ, সিরিয়ার মধ্য দিয়ে সামরিক অস্ত্র সরবরাহের যে পথ ছিল হিজবুল্লাহর, তা এখন আর নেই। পরিবর্তিত এই অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে আমাদের।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসাদের শাসনামলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ছিল সিরিয়ার মধ্য দিয়ে। হিজবুল্লাহর কাছে পাঠানো সরঞ্জামগুলো ইরান থেকে ইরাক ও সিরিয়া হয়ে লেবাননে পৌঁছাত।

কাশেম আশা প্রকাশ করে বলেন, সামনে কোনো নতুন সরকার আসতে পারে এবং এই রাস্তা আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। অথবা আমরা কোনো বিকল্প রাস্তার খোঁজ করতে পারি। আমরা আশা করি (সিরিয়ার) নতুন শাসক গোষ্ঠী ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না। হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেছে। আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধও করেছে তারা। তবে আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের শাসন শেষে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেছে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা। তুরস্কের সমর্থনপুষ্ট এই বিদ্রোহীরা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিতও দিয়েছে বলে দাবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর। আর সেটি সত্যি হলে আসাদ পরিবারের পতনে সবচেয়ে লাভবান ইসরায়েলকেই বলা যায়। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত