পরীক্ষা দিয়ে হতে হবে উপসচিব ও যুগ্মসচিব

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৫৬ এএম

উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেতে কর্মকর্তাদের পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষায় ৭০ না পেলে পদোন্নতি হবে না। বর্তমানে উপসচিব পদে পদোন্নতির ৭৫ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডারের এবং বাকি ২৫ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত। এ বিধানও থাকবে না। পদোন্নতি পরীক্ষায় ৭০ পেলে যে কেউ উপসচিব হতে পারবেন। এসব পরীক্ষার বাইরে থাকবে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি।

গতকাল মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে মতবিনিয়ময় সভায় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান, কমিশন সদস্য অধ্যাপক ড. সৈয়দা শাহিনা সোবহান, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মেহেদী হাসান,  ড. মোহাম্মদ তারেক, ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া এবং ড. মো. হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।

পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা এটাই প্রথম না। এর আগে সিভিল সার্ভিস অ্যাক্টে এই বিধান করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জুনিয়র কর্মকর্তাদের বাধার মুখে তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় ওই সময়ের সরকার। সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট পরে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ হিসেবে পাস হয়। যাতে পরীক্ষা দিয়ে পদোন্নতির বিধান রাখা হয়নি। গতকাল এ সংক্রান্ত সুপারিশের কথা জানাজানি হলেও তরুণ কর্মকর্তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের বক্তব্য হচ্ছে সিনিয়রদের পদোন্নতি পরীক্ষা দিতে হয়নি। আমাদের কেন পরীক্ষা দিয়ে পদোন্নতি পেতে হবে। কিন্তু জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে এ বিধান চালু করতে পারলে তা বড় পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রশাসন থেকে দলীয়করণ দূর হবে। উপসচিব পদোন্নতি থেকে ২৫ শতাংশ কোটা তুলে দিতে পারলে এর মাধ্যমে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর হবে। আর অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদ রাজনৈতিক বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এই ধাপ থেকে অতিরিক্ত সচিব পদটি বাদ দিতে পারলে ভালো হয়। কারণ সচিবের পরও সিনিয়র সচিব নামে আরও একটি পদ রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় কমিশনের চেয়ারম্যান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কার কমিশন প্রশাসন ক্যাডার ও অন্যান্য ক্যাডার থেকে সমান সমান পদোন্নতির সুপারিশ করবে।’  এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘কমিশন সরকারি চাকরি এবং পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন অপসারণের সুপারিশ করবে। প্রত্যেক নাগরিকের পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আইনি বাধা না থাকলে, বিশ্বের যে কোনো জায়গায় ভ্রমণ করার অধিকার সবার আছে।  ইংল্যান্ডে আবেদন করলে পোস্ট অফিসে পাসপোর্ট চলে আসে। প্রত্যেক নাগরিকের পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার আছে।’

মূলত সরকারি চাকরি বা পাসপোর্ট পেতে পুলিশি ভেরিফিকেশনের নামে ব্যক্তি শত্রুতা, রাজনৈতিক ক্রোধ, দুর্নীতির পথ খোলা ছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেই নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে হয়রানি করা হয়। আর পাসপোর্টে ভেরিফিকেশনের এই অপশনের কারণে একই ব্যক্তির একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে। এই ভেরিফিকেশন না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে।

কমিশনের প্রধান বলেন, ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডার অযৌক্তিক। আমরা সুপারিশ করছি, এসব ক্যাডার না রাখার। একজন চোখের ডাক্তার, একজন দাঁতের ডাক্তার, আরেকজন জেনারেল ফিজিশিয়ান পদোন্নতি কি তারা একসঙ্গে পাচ্ছেন? পাচ্ছেন না। সে জন্য আমরা বলেছি, এটা ক্যাডারে রাখা যাবে না। এটা আমাদের চিন্তা যে এটা ক্যাডার করা অযৌক্তিক হয়েছে। এগুলোকে আলাদা করতে হবে। বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হোক, এটা বিশেষায়িত বিভাগ। এই দুই বিভাগ ছাড়া বাকি সবই ক্যাডার থাকতে পারবে। কিন্তু এই বিভাগে এটা সম্ভব নয়। আমাদের ধারণা এটা। এখন আমরা আলাপ-আলোচনা করব।’

এ সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে সরে গিয়ে আমাদের জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আলাদা হয়েছে। ঠিক এ রকম আমরা স্বাস্থ্য কমিশন আলাদা ও শিক্ষা ক্যাডারকে আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছি।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনসাধারণের জন্য দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। কমিশন এই খাতে কর্মরত পেশাদারদের জন্য বিশেষ সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর নির্ভর করবে।’

সংস্কার কমিশন তথ্য অধিকার নিয়েও কাজ করছে। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, ‘আমরা তথ্য অধিকার আইনকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিটি জেলা এবং বিভাগে এ বিষয়টি দেখভাল করতে একজন করে কর্মকর্তা দেওয়া হবে। তবে এখনো তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ সেভাবে হচ্ছে না।’

সিনিয়র সচিব মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘ফরিদপুর ও কুমিল্লাকে বিভাগ করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই সব এলাকার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার কমিশন দুটি বিভাগ করার পরামর্শ দেবে। এই দুটি বিভাগ করতে গেলে দুএকটা জেলা এই বিভাগ থেকে ওই বিভাগে দিতে হবে, আমরা ম্যাপ করে দিয়েছি। একটি ম্যাপ দেখলেই বোঝা যাবে, সামনে ১০টি বিভাগ এবং কোন কোন জেলাকে কোন জায়গায় দেওয়া হয়েছে। সব বিভাগকে টাচ করা হয়নি। এখানে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামকে টাচ করা হয়েছে, যাতে কুমিল্লা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ সে রকম হয়। এটা একটা বড় সিদ্ধান্ত। আমরা দিয়েছি, সরকার যদি মনে করে ১০টা বিভাগ করবে, ভালো।’

এর আগে গত বছরের ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি ফরিদপুর ও কুমিল্লাকে বিভাগে উন্নীত করতে চান এবং এর নাম হবে পদ্মা ও মেঘনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তখন জোর দিয়েই বলেন, ‘আমি কুমিল্লা নামে দেব না। কারণ  এই কুমিল্লা নামের সঙ্গে মোশতাকের (খন্দকার মোশতাক আহমেদ) নাম জড়িত। সেজন্য আমি দেব না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত