নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে বিএনপির যে প্রত্যাশা ছিল তা পূরণ হয়নি। দলটির নেতারা মনে করেন, ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব। গতকাল বুধবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দলটির নেতারা এসব মন্তব্য করেন।
গতকাল মহাখালী কড়াই বস্তি বনানী ৫ নম্বর রোডে আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন ময়দানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও প্রথম কাজ হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন করা। আর সে জন্য কিছু আইনি সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও মাঠের সংস্কার দরকার। আমরা পর্যবেক্ষণ করে ও বিশ্লেষণ করে বের করেছি, এক্ষেত্রে সংস্কারে চার থেকে ছয় মাস বেশি সময় লাগার কথা নয়।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক যাত্রায় কোনো কৌশল অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োগ করবে বলে আমরা মনে করি। জনগণ ভোটের অপেক্ষায় আছে, তাই যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার সেরে ভোটের আয়োজন করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যর্থতায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ফ্যাসিবাদের অনেক দোসর পালিয়ে গেছে। দোসরদের পালাতে যারা সহযোগিতা করেছে, তাদের চিহ্নিত করার দাবি জানাই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে বিএনপির এ নেতা বলেন, ‘সংবিধানে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি ফিরে আসা দেশ ও জাতির জন্য ইতিবাচক।’
এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ১২ দলীয় জোটের উদ্যোগে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে ভারত সরকার ও মিডিয়ার অপপ্রচার এবং ভারতীয় আগ্রাসন রুখে দাও’ শীর্ষক প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্র মেরামত করার লক্ষ্যে ৩১ দফা নিয়ে কাজ করছি। অতি দ্রুত জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। এরশাদের পতনের সময় কতদিন পর নির্বাচন হয়েছিল সেটি সবারই মনে থাকার কথা। নির্বাচন করতে কতদিন লাগে সেটি দেশের মানুষ জানে। যেহেতু পতিত স্বৈরাচারী সরকার সাড়ে ১৫ বছরে দেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, সে জন্যই সব রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করছে। কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিতে হবে। সব সংস্কার তো আপনারা করতে পারবেন না। কখন নির্বাচন হবে সেটা স্পষ্ট করুন।’ তিনি বলেন, ‘উনাদের (অন্তর্বর্তী সরকারের) বক্তব্য কোনটা বিশ্বাস করব? প্রধান উপদেষ্টা বললেন, ডিসেম্বরের শেষের দিকে (২৫ সাল) এবং ২৬ সালের প্রথম দিকে নির্বাচন হতে পারে। পরের দিনই উনার (প্রধান উপদেষ্টা) প্রেস সচিব বললেন, এটা আবার ২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত যেতে পারে। উনাকে (প্রেস সচিব) ক্ষমতা কে দিল? প্রধান উপদেষ্টাকে তো আমরা সবাই মিলে বানিয়েছি, দেশের মানুষ বানিয়েছে। প্রেস সচিব মহোদয় আপনি তো সরকারি চাকরি করেন, সরকারের বেতন নেন। আপনি (প্রেস সচিব) কোত্থেকে এই ক্ষমতা পেলেন। আপনি আপনার প্রধান উপদেষ্টাকেও ক্রস করে চলে গেলেন। কাজেই আমাদের জানতে আগ্রহ হয়, কোনটা ঠিক। অন্তর্বর্তী সরকার নিজেরা ঠিক করুন কে কোন কথা বলবেন, দায়িত্ব নিয়ে বলবেন। একেকজন একেক কথা বললে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি হবে।’
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার টুইটে যে মনোভাব প্রকাশ করেছেন সেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যে ষড়যন্ত্র রেসকোর্সে হয়েছিল সেটিই। গত ১৭ বছরে ভারতকে বাংলাদেশ শুধু দিয়েই গেছে। বলা হয়েছে বাংলাদেশ দিয়ে ভারত ট্রানজিট নিলে বাংলাদেশ নাকি সিঙ্গাপুর হবে? তাহলে আখাউড়া দিয়ে ভারতের এত ট্রাক গেলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু কমছেই। বিগত বছরগুলোতে আমাদের শুধু ভুল বোঝানো হয়েছে। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশে দাঁড়িয়েছিল সেজন্য কৃতজ্ঞ। তবে বিগত বহু বছর তারা কড়ায়-গণ্ডায় প্রতিদান আদায় করেছে। আজও ফারাক্কার পানির সমস্যা নিরসন, সীমান্তে মানুষ মারা, ভারতের বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশে অনাকাক্সিক্ষত বন্যা, পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে।’
ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘স্বৈরাচারের দোসরদের বিচার বহু বছর পর হয়েছে। সুতরাং আগামীতেও সে রকম হবে না সেটি ভাবার কিছু নেই। এত পরিমাণ গুম, খুন ও লুট করেও রক্ষা হয়নি। নিজেকে বাঁচানোর ভয়ে আপনি (সালমান এফ রহমান) নিজের দাড়ি কামিয়েছেন। প্রত্যেকটা কাজের হিসাব কিন্তু আগামী প্রজন্মের কাছে দিতে হবে। কেউ হয়তো নেদারল্যান্ডস গেছেন। কলকাতা গেছেন। কেউ চট করে ঢোকার চেষ্টা করছেন। সৎসাহস থাকলে ঢোকেন, বিচারের মুখোমুখি হন।’
১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের সভাপতিত্বে ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদার সঞ্চালনায় প্রতিবাদ সমাবেশে বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বেপারী, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবদুল করীম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
