রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের শাহ মখদুম রোডের ‘লাভ লীন বাংলা রেস্টুরেন্টে’ অগ্নিকা- হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের চেষ্টায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর দুপুর সোয়া ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভবনটি আবাসিক হলেও বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভবনটিতে ফায়ার সেফটি ছিল না।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, ১০টা ৪৪ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের একে একে আরও ১১টি ইউনিটসহ ১৩৩ জন ফায়ার ফাইটার আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দুপুর ২টা ২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বিকেল ৩টায় আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ হয়। তবে এই ঘটনায় কোনো হতাহত খবর পাওয়া যায়নি। আগুনে ভবনটির নিচ থেকে চারতলা পর্যন্ত পুড়ে যায়। ভবনটিতে যে ব্যবসায়ী আছেন, তাদের কত টাকা ক্ষতি হয়েছে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে থাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা ভবনটিতে ফায়ার ফাইটিং-কোনো ইক্যুইপমেন্ট পাইনি। আমাদের জানামতে, ভনটিতে নোটিস দিয়েছিলাম। এখানে ফায়ার সেফটি প্ল্যানও নেই। তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে আরও তথ্য দিতে পারব। বহুতল ভবনটি আবাসিক হলেও সেখানে রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এ ছাড়া এই ভবনটিতে একটিমাত্র সিঁড়ি রয়েছে। আমরা বাইরে থেকে বৈদ্যুতিক তারের কারণে টিটিএল (টার্ন টেবল লেডার) সেট করতে পারছিলাম না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগুন লাগার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পান, আগুন ডেভেলপমেন্ট স্টেজে চলে গেছে। এটা গ্যাসের লিকেজ থেকে যেহেতু হয়েছে, সুতরাং নিচের ফ্লোরে গ্যাসের উপস্থিতি ছিল। এখানে অনেক পেট্রোলিয়াম দ্রব্যাদি ছিল। ভবনটিতে রেস্টুরেন্ট, জিম, বিউটি পার্লার রয়েছে। ওপরে মানুষের বসবাস ছিল। পাঁচতলা ভবনটির ছয়তলায় (ছাদে) টিনশেড করা ছিল। ভবনটি থেকে সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আগুন নির্বাপণের পর ভেতরে তল্লাশি করে কাউকে পাওয়া যায়নি। এখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে।’
রেস্টুরেন্টে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার হচ্ছিল, এটার অনুমোদন আছে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এলএনজি গ্যাসের চেয়ে সিলিন্ডার গ্যাস বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অল্পতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা এসে দেখেছি নিচতলা এবং দোতলায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এজন্য আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে। আর গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অনুমোদনের বিষয়গুলো বিস্ফোরক অধিদপ্তর বলতে পারবে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে সিটি করপোরেশন দেখে। তারা বলতে পারবে। ঘটনার পর আমরা ভবন মালিককে খুঁজেছি, পাইনি। আমাদের পরিদর্শকদের কাজই ভবন পরিদর্শন করে নোটিস দেওয়া। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে বাদবাকি তথ্য নিশ্চিত হতে পারব।’ এদিকে স্থানীয় ভ্রাম্যমাণ দোকানদার আমজাদ আলী বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে সড়ক। আশপাশে তাকানোর আগেই মাটিতে বসে পড়ি। মনে হলো কেউ বোমা নিক্ষেপ করছে। মাথা উঁচু করে দেখতেই বিল্ডিংয়ে কালো ধোঁয়া ছেয়ে গেছে। সামনে একটু এগোতেই দেখা যায় একটি রেস্টুরেন্টের ভেতরে সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরণ হচ্ছে। আশপাশের লোকজন ছোটাছুটি করছে। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, আগুনে পুড়ে গেছে রেস্টুরেন্টের চেয়ার-টেবিল, হাঁড়ি-পাতিল ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালপত্র। পাশাপাশি স্বপ্ন বিউটি কেয়ার ও তৃতীয়তলায় গ্যালাক্সি জিমের মালামালও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উত্তরায় বহুতল এ ভবন ঢাকা-১৮ আসন সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসানের ভাগ্নে কবির হাসানের। উত্তরার রাজউক থেকে আবাসিক প্লট হিসেবে কেনেন। স্থানীয় ও বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। পেশিশক্তি খাটিয়েই ভবনটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন কবির হাসান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তরার প্রতিনিধি আরিফিন সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার হয়নি। অনেক বড় দুর্ঘটনা থেকে মানুষ রক্ষা পেয়েছে। উত্তরায় অধিকাংশ সেক্টরে আবাসিক বাড়িগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলমান। প্রশাসনের এখনই এদিকে নজর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া সেক্টর কল্যাণ সমিতির বড় ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে এরকম দুর্ঘটনা ঘটতে থাকবে।’
