কেয়ামত আরবি শব্দ। এর অর্থ উঠে দাঁড়ানো। আর পরিভাষায় কেয়ামত হলো, আল্লাহর সব সৃষ্টির ধ্বংস শেষে বিচার দিবস। ইসলামি আকিদা অনুসারে হজরত ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার মাধ্যমে কেয়ামত শুরু হবে। সেদিন আল্লাহ এই বিশ্বজগৎ এবং এর সবকিছু ধ্বংস করে দেবেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সেই দিনটি হবে অনেক কঠিন দিন।’ (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত ৮-৯)
কেয়ামতের আলামত : কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে মহান আল্লাহ তা গোপন রেখেছেন। তিনি ছাড়া কেউ তা জানেন না। যখন আল্লাহর নির্ধারিত সময় চলে আসবে তখন কেয়ামত সংঘটিত হবে। কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে কিছু আলামতের প্রকাশ ঘটবে। আর এ আলামতগুলোকে দুভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ছোট আলামত ও বড় আলামত। ছোট আলামতগুলো প্রথমে প্রকাশ পাবে। তারপর ধীরে ধীরে বড় আলামতসমূহ প্রকাশ পেতে থাকবে।
ছোট আলামত : ছোট আলামত বলতে যেসব লক্ষণকে বোঝানো হয় যা কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই প্রকাশ পাবে। হাদিসের আলোকে ছোট আলামতগুলো উল্লেখ করা হলো। এক. ইলম (ইসলামি জ্ঞান) উঠে যাবে। দুই. মূর্খতা বৃদ্ধি পাবে। তিন. ব্যভিচার বেড়ে যাবে। চার. মদ্যপান বৃদ্ধি পাবে। পাঁচ. সর্বত্র অন্যায়-অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়বে। ছয়. গান-বাজনা বৃদ্ধি পাবে। সাত. গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপকতা লাভ করবে। আট. সুদ ও ঘুষের ব্যাপক প্রচলন হবে। নয়. মিথ্যা সাক্ষীর প্রসার হবে আর সত্য সাক্ষ্য গোপনের প্রবণতা বাড়বে। দশ. মিথ্যা বলা বেড়ে যাবে। এগারো. সমাজে খুনখারাবি, রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড বেশি হবে। বারো. নতুন নতুন রোগব্যাধি, বালা-মুসিবত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে। তেরো. আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। চৌদ্দ. ভূমিকম্প ও ভূমিধস হবে। পনেরো. নানা ধরনের ফেতনা-ফ্যাসাদ প্রকাশ পাবে। ষোলো. মানুষের অন্তরে হিংসা ও কৃপণতা বৃদ্ধি পাবে। সতেরো. পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে। আঠারো. নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। উনিশ. সমাজের ভালো লোকেরা দ্রুত বিলুপ্ত হবে এবং নিচু লোকদের উত্থান হবে। বিশ. নিচু শ্রেণির লোকেরা বড় বড় প্রাসাদের মালিক হবে। একুশ. মানুষ সুউচ্চ প্রাসাদ ও অট্টালিকা নির্মাণ করে পরস্পর অহংকার ও গর্ব করবে। বাইশ. অশিক্ষিত ও অযোগ্য ব্যক্তিরা সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবে। তেইশ. ধন-সম্পদের প্রাচুর্য হবে। চব্বিশ. জাকাত গ্রহণের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। পঁচিশ. আরব মরুভূমিগুলো সবুজ-শ্যামল উদ্যানে পরিণত হবে। ছাব্বিশ. ফোরাত নদীর তলদেশ থেকে স্বর্ণের খনি বের হবে। সাতাশ. সময় দ্রুত চলে যাবে। আটাশ. ইসলাম শুধু কথায় থাকবে, বাস্তবে সম্পূর্ণ বিপরীত আমল হবে। ঊনত্রিশ. সমাজে কারি, ফকিহ ও আলেম কমে যাবে। ত্রিশ. মানুষ কোরআন বিমুখ হয়ে যাবে এবং অন্য বইয়ের কদর ও বিস্তার হবে। একত্রিশ. পার্থিব উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করা হবে। বত্রিশ. আমানতের খেয়ানতসহ মুনাফেকের সব আলামত প্রকাশ পাবে। তেত্রিশ. শিরক ও বিদয়াতে দুনিয়া ভরপুর হবে। চৌত্রিশ. মসজিদগুলোকে অতিরিক্ত সাজসজ্জা করা হবে এবং সেগুলো হবে হেদায়েত-শূন্য। পঁয়ত্রিশ. মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা ও হট্টগোলের প্রবণতা দেখা দেবে। ছত্রিশ. পিতাকে দূরে রেখে বন্ধুদের কাছে টানা হবে। সাঁইত্রিশ. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের প্রবণতা বাড়বে। আটত্রিশ. শুধু পরিচিত ও বিশিষ্টজনদের সালাম দেওয়ার প্রচলন হবে। ঊনচল্লিশ. মানুষকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্ট ও ক্ষতির ভয়ে। চল্লিশ. মুসলমানদের মধ্যে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুর প্রতি অনীহা সৃষ্টি হবে।
বড় আলামত : কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে কেয়ামতের বড় বড় কিছু আলামত প্রকাশিত হবে। এ প্রসঙ্গে হুযায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দশটি নিদর্শন না আসা পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবে না। সেগুলো হলোÑ এক. ধোঁয়া, যা পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত একনাগাড়ে চল্লিশ দিন বিস্তৃত হবে। দুই. দাজ্জাল বের হবে। তিন. দাব্বাতুল আরদ বা এক প্রকার চতুষ্পদী জন্তু মাটি ফুঁড়ে বের হবে। চার. পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় হবে। পাঁচ. আকাশ থেকে হজরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ। ছয়. ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে। সাত. পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে ভূমিধস হবে। আট. পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিধস হবে। নয়. আরব উপদ্বীপে ভূমিধস হবে। দশ. সবশেষে ইয়েমেন থেকে এমন এক আগুন বের হবে, যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম ২৯০১)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামত তখনই সংঘটিত হবে, যখন জমিনের মধ্যে আল্লাহ, আল্লাহ বলার মতো কোনো মানুষ থাকবে না।’ (সহিহ মুসলিম ১৪৮) উল্লেখ্য যে, ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ বলতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’-কে বুঝানো হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিকৃষ্ট মানুষের ওপরই কেয়ামত কায়েম হবে।’ (সহিহ মুসলিম ১৯২৪) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে আরেক হাদিসে বর্ণিত, তিনি রাসুল (সা.) থেকে (কেয়ামতের পূর্বের অবস্থা সম্পর্কে) বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহতায়ালা মৃদু বাতাস প্রেরণ করবেন। সেটার ঘ্রাণ হবে মিশকে আম্বরের মতো। আর স্পর্শ হবে রেশমের মতো কোমল। সেই বাতাস এমন কোনো আত্মা বাঁচিয়ে রাখবে না, যার অন্তরে সরিষার দানা সমপরিমাণ ইমান আছে। দুনিয়াতে বদকার লোকেরাই জীবিত থাকবে। তাদের ওপরই কেয়ামত সংঘটিত হবে।’ (সহিহ মুসলিম ১৯২৪) আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে কেয়ামতের ভয়াবহতা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের সবাইকে আল্লাহর দেওয়া কিতাব কোরআনের বিধান এবং রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন গড়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
