রাজধানীর শাহবাগ, কাকরাইল ও বনানী-কাকলী মোড়ে বিভিন্ন দাবিতে গতকাল রবিবার সড়ক অবরোধ করে কয়েকটি সংগঠন। এতে এসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানী জুড়ে ছিল তীব্র যানজট। এর মধ্যে সোয়া চার ঘণ্টা ঢাকার ব্যস্ততম মোড়গুলোর একটি শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন ট্রেইনি চিকিৎসকরা। কাকরাইল মসজিদের মোড়ের সড়ক আটকে এক ঘণ্টা অনশন করেন ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া বনানী-কাকলী মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন সড়কে অবরোধ থাকায়
ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গণপরিবহনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় আটকে ছিল।
দেশের পোস্ট গ্রাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি চিকিৎসকদের রাজধানীর শাহবাগ অবরোধের কারণে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে। গতকাল দুপুর থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন চিকিৎসকরা। এতে চারপাশের সব পথ ও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও সামনে এগোতে পারেনি। যানজট ছড়িয়ে পড়ে সায়েন্স ল্যাব, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও মৎস্য ভবন হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে।
অবরোধ চলাকালে শাহবাগের চারপাশের সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে ছিল। মূল সড়কের পাশাপাশি ফুটপাতও বন্ধ থাকায় হেঁটে পথ পাড়ি দিতেও বেশ বেগ পেতে হয় পথচারীদের। বিশেষ করে শাহবাগের দুই বড় হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কষ্ট হয় সবচেয়ে বেশি। অনেক দূরে যানবাহন থেকে নেমে হেঁটে হাসপাতালে আসতে দেখা গেছে অনেক রোগীকে।
দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে কথা হয় দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী থেকে আসা আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি স্ত্রী নুরজাহানকে এনেছেন বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু তাদের রিকশা চারুকলা পর্যন্ত এসে আর এগোতে পারেনি। সেখানেই নেমে পড়তে হয়েছে। হেঁটেই স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আলমগীর হোসেন।
আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবাজার পর্যন্ত জ্যাম। সেখান থেকে চারুকলা পর্যন্ত আসতে তাদের এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। কিন্তু এরপর আর রিকশা এগোতে পারছে না। তারা এখন পায়ে হেঁটেই হাসপাতালে যাবেন ভাবছেন। কিন্তু স্ত্রী খুব অসুস্থ। কতটুকু যেতে পারবেন বুঝতে পারছেন না। তা ছাড়া দেরি হওয়ায় চিকিৎসকও পাবেন কি না তাও অনিশ্চিত।
একই অবস্থা দেখা গেল বাটা সিগন্যাল মোড় থেকে বিএসএমএমইউ পর্যন্ত সড়কে। সেখানেও রোগীরা অটোরিকশা ও রিকশা থেকে নেমে হেঁটে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে পরীবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের গলিতে কথা হয় আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি ছোট বোন রোকসানাকে নিয়ে এসেছেন বিএসএমএমইউতে এক চিকিৎসককে দেখানোর জন্য। অন্য সময় রিকশা গলি পেরিয়ে হাসপাতালের এক নম্বর গেটে চলে যায়। কিন্তু জ্যামের কারণে গতকাল তাকে নামতে হয় পরীবাগ সড়কের মাঝামাঝিতে। এখন কষ্ট করে বোনকে নিয়ে হেঁটেই যেতে হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসক পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনই না, যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বিভিন্ন কাজের উদ্দেশে আসা পথচারীদেরও। এ সময় তাদের সঙ্গে অবরোধকারী চিকিৎসকদের বাগ্বিত-া ও কথা কাটাকাটি হতে দেখা গেছে। বিক্ষুব্ধ পথচারীরা জানিয়েছেন, দাবি আদায়ের জন্য অবরোধের নামে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেছেন। তাদের চলাচল করতে দিচ্ছেন না। যানবাহন যেতে পারছে না। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের দাবির জন্য মানুষ কেন দুর্ভোগ পোহাবে?
মিরপুর-১৩ থেকে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শাহরিয়ার হোসেন শাহবাগ রমনার গেটের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে জ্যামে আটকে ছিলেন। তিনি যাচ্ছেন নীলক্ষেত মোড়ে। শাহরিয়ার বলেন, চিকিৎসকদের শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবরোধ করা উচিত হয়নি। তারা দাবি-দাওয়া নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে পারেন। লোকজনকে কষ্টে ফেলে এভাবে দাবি আদায় ঠিক নয়।
গতকাল দুপুর ১টা থেকে বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন চিকিৎসকরা। পরে ভাতা বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু ভাতা বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে বলে জানিয়েছেন তারা। ‘ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস সোসাইটি’ ও তার সহযোগী সংগঠন ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন’র (পিপিটিডিএ) নেতৃত্বে এই আন্দোলন করছেন চিকিৎসকরা।
শাহবাগের অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে সন্ধ্যায় ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কর্মবিরতি চলবে। কিন্তু জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ও দাবি পূরণে সরকারের আশ্বাসে শুধু অবরোধ প্রত্যাহার করেছি। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য সচিব কথা দিয়েছেন যে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা দেবেন ও বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করবেন। সে জন্য অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে।’
এই চিকিৎসক নেতা জানান, চিকিৎসকদের আট সদস্যের প্রতিনিধিদল দুপুর দেড়টার দিকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানেই ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর বিকেল ৫টার দিকে শাহবাগে আসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলেন, আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে। এ সময়ের মধ্যে সমাধান না হলে তিনিসহ চিকিৎসকরা আবার রাস্তায় নামবেন। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে সমস্ত চিকিৎসককে নিয়ে বিএসএমএমইউয়ের বটতলায় গিয়ে আলোচনা করে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
এর আগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে আন্দোলনরত প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের শাহবাগ মোড় ছাড়ার আহ্বান জানান বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। দুপুরে তিনি শাহবাগ মোড়ে এসে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, ‘চিকিৎসকদের ভাতা বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। উপাচার্য হিসেবে এই দাবি আদায়ে আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি। আশা করছি এই সপ্তাহের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন চলে আসবে। এটা খুবই দুর্ভাগ্য যে দাবি আদায়ে চিকিৎসকদের সেবা বাদ দিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করতে হচ্ছে। আমরা চাই আর কখনই যেন চিকিৎসকদের দাবি-দাওয়া আদায়ে এভাবে রাজপথে নামতে না হয়।’
এ সময় উপাচার্য আন্দোলনরত চিকিৎসকদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শাহবাগের চতুর্দিকে যানজট ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন, বিভিন্ন দিক থেকে হাসপাতালে আসা রোগীরাও দুর্ভোগে পড়েছেন।’
ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ২০২২ সাল থেকেই আন্দোলন করছেন পোস্ট গ্রাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি চিকিৎসকরা। তাদের দাবির মুখে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পাঁচ হাজার টাকা ভাতা বাড়ানো হয়। এখন তারা ভাতা পাচ্ছেন ২৫ হাজার টাকা। চিকিৎসকদের দাবি এই ভাতা ৫০ হাজার টাকা করতে হবে।
