জ্ঞানচর্চায় নারী সাহাবিদের অবদান

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:০০ এএম

যুগে যুগে নারীরা সাংসারিক কাজের পাশাপাশি অন্যান্য কাজেও বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। নিজেদের মেধা ও মনন দিয়ে জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন সাহাবিদের মধ্যে পুরুষদের অধিকাংশই বৈষয়িক ও ধর্মীয় জ্ঞানে আগ্রহী ছিলেন তখন নারী সাহাবিরাও জ্ঞান চর্চায় অবদান রাখেন। ইসলামের মহান শিক্ষা কেবল পুরুষদের জন্য নয়, বরং নারীদের জন্যও সমানভাবে উন্মুক্ত ছিল। নারী সাহাবিরা প্রমাণ করেছিলেন যে, তারা কেবল গৃহকর্ম বা পরিবার পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা ধর্মীয়, সামাজিক ও বৈষয়িক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করে সমাজে ভূমিকা পালন করতেও সক্ষম। তাদের অমূল্য অবদান আজও ইসলামি জ্ঞানচর্চায় প্রেরণা হয়ে আছে।

জ্ঞান চর্চায় নারী সাহাবিদের মধ্যে আয়েশা (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কোরআন, হাদিস, ইসলামি আইন এমনকি রাজনৈতিক বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তিনি অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিদের মধ্যে একজন। কোরআনের তাফসির, হাদিনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন অনন্যা। তার বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২২১০টি। আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের কাছে কোনো হাদিস বোঝা কষ্টসাধ্য হলে আয়েশা (রা.)-কে প্রশ্ন করে সেই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান লাভ করেছি। (তিরমিজি)

উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালমা (রা.) ৩৭৮টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাফসা (রা.), সাফিয়া (রা.), উম্মে হাবিবা (রা.), ফাতিমা (রা.), জুওয়াইরিয়া (রা.), আসমা বিনতে আবু বকর (রা.), উম্মে আতিয়া (রা.), ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা.), উম্মে হানী (রা.), আসমা বিনতে ইয়াযিদ (রা)-সহ প্রমুখ নারী সাহাবি রাসুল (সা.) থেকে বহুসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন।

ফিকহ শাস্ত্রে নারী সাহাবিদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। আয়েশা (রা.) কর্র্তৃক এত অধিক ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে, যা একত্রিত করলে এক বৃহৎ গ্রন্থ হয়ে যেতে পারে। অনুরূপ উম্মে সালমা (রা) কর্র্তৃক বর্ণিত ফাতোয়াগুলো একটি পুস্তিকার আকার ধারণ করতে পারে। ফতোয়া প্রদানকারী নারী সাহাবিদের মধ্যে হাফসা (রা.), উম্মে হাবিবা (রা.), উম্মে আতিয়া (রা.), সাফিয়া (রা), লায়লা বিনতে কায়েস (রা.), উম্মে দারদা (রা.), জয়নব বিনতে উম্মে সালামা (রা.), আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ফারায়েজ (মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ সম্পর্কিত বণ্টননীতি) বিষয়ে আয়েশা (রা.)-সহ অন্যান্য নারী সাহাবিরাও পারদর্শী ছিলেন। জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্য অনেকেই নারী সাহাবিদের শরণাপন্ন হতেন। এসব মহীয়সী নারীরা তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার দ্বারা মুসলিম উম্মাহকে সব সমস্যার সমাধান দিয়ে সাহায্য করেছেন।

অনেক নারী সাহাবি কোরআনুল কারিমের দরস দিতেন। রাবিতা বিনতে হায়্যান, উম্মে ইমাম বিনতে হারিসা, হিন্দ বিনতে উবায়েদ, উম্মে সাদ ইবনে রবি (রা.) প্রমুখ মহিলা সাহাবি পবিত্র কোরানের বেশিরভাগ আয়াতের হাফেজা ছিলেন।

আরবি সাহিত্যে নারী সাহাবিদের অতুলনীয় অবদান রয়েছে। খানসা বিনতে আমর ইবনুশ শারিদ (রা.) একজন বিখ্যাত সাহাবি ও কবি ছিলেন। আরবি সাহিত্যে নারী কবিদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। তার ভাই সাখর ইবনে আমর ও মুয়াবিয়া ইবনে আমরের মৃত্যুতে শোকগাথা কবিতা রচনা করে আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ইসলাম নিয়ে যেসব জাহেলি কবি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করত, তিনি কবিতা দিয়েই সেগুলোর জবাব দিতেন। এ ছাড়া আয়েশা (রা) কবিতা রচনা করতেন। তিনি বহু কবিতা কণ্ঠস্থ করেছিলেন এবং কবিতা আবৃত্তিও করতেন। তিনি একজন বিদুষী কবি ছিলেন। অন্যদের মধ্যে সাওদা, উমামা, হিন্দ বিনতে হারিস, উম্মে আয়মান, মায়মুনা, রুকাইয়া, আতিকা বিনতে যায়েদ, কসবা বিনতে রাফে, বালাবিয়া (রা.) প্রমুখ নারী সাহাবি কবিতায় অতিশয় খ্যাতি লাভ করেন।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিভাবান নারী সাহাবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর শাসনামলে তারা কখনো কখনো আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তার সিদ্ধান্তকে অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)-এর সিদ্ধান্তকে ওমর (রা.) অনুমোদন করতেন। অনেক নারী সাহাবি চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে তারা মুসলিম সৈন্যদের সেবায় নিয়োজিত হতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত