এফটির প্রতিবেদন

টিউলিপকে ফ্ল্যাট উপহার আ.লীগ ঘনিষ্ঠজনের

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৫৮ এএম

বাংলাদেশের পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৪০০ কোটি পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগ, বাড়ির এনার্জি পারফরম্যান্স সার্টিফিকেট না থাকার কারণে জরিমানার মুখোমুখি হওয়া, একটি ফ্ল্যাট থেকে আয়ের তথ্যের অস্বচ্ছতা, দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার দাবিসহ নানা কারণে কিছুদিন ধরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারের আর্থিক সেবাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক। দেশটির আর্থিক খাতে দুর্নীতি বন্ধের দায়িত্বেও আছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ। সেই টিউলিপের বিরুদ্ধে এবার আরেকটি ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ উঠল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস (এফটি) সম্পত্তি নিবন্ধকের দপ্তরের নথির বরাত দিয়ে গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ ২০০৪ সালে কিংস ক্রসের কাছে দুই বেডরুমের একটি ফ্ল্যাট বুঝে নেন এবং তার বিনিময়ে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয়নি তাকে। আর এ সম্পত্তির হিসাবও তিনি প্রকাশ করেননি। অবশ্য সম্পত্তি নিবন্ধকের দপ্তরের এক নথি বলছে, টিউলিপ যখন ওই ফ্ল্যাট ‘উপহার পেয়েছিলেন’ তখনো তিনি এমপি হননি। ফলে সম্পত্তির হিসাব প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা তার ছিল না।

ফিনান্সিয়াল টাইমস বলছে, নথি অনুসারে আবদুল মোতালিফ নামের এক ব্যক্তি ২০০১ সালে ফ্ল্যাটটি কেনেন। পরে মোতালিফ ‘কৃতজ্ঞতার নিদর্শন’ হিসেবে টিউলিপকে উপহার দিয়েছেন সেটি। অবশ্য এমপি হওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি ৯০ হাজার পাউন্ডে কিংস ক্রসের ওই ফ্ল্যাটের লিজ নবায়ন করেন। পাশাপাশি নিজের নির্বাচনী এলাকা হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটে স্বামীর সঙ্গে মিলে আরেকটি ফ্ল্যাট তিনি কেনেন। কোনো বাসার জন্যই এখন তার কোনো কিস্তি বাকি নেই।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবদুল মোতালিফ একসময় ছোট একটি আবাসন কোম্পানির মালিক ছিলেন, সেই কোম্পানি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিংস ক্রসের ওই ফ্ল্যাট কেনার বিষয়টি তিনি প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে তারপর সেটি নিয়ে কী হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য তিনি করতে চাননি।

অবশ্য টিউলিপকে ‘ফ্ল্যাট দেওয়ার’ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত, এমন এক ব্যক্তি বলেছেন, মোতালিফ ওই ফ্ল্যাট টিউলিপকে উপহার দিয়েছেন ‘কৃতজ্ঞতার নিদর্শন’ হিসেবে, কারণ তিনি নিজে যখন দুর্দশার মধ্যে ছিলেন, টিউলিপের বাবা-মা তাকে আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়েছিলেন।

ফিনান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, কিংস ক্রসের ওই ফ্ল্যাট টিউলিপকে দেওয়ার আগে মোতালিফ সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন মঈন গণি নামের এক আইনজীবীকে। মঈন গণি আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে মামলা লড়েছেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ছবিও রয়েছে। ওই ফ্ল্যাটের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি সাড়া দেননি।

টিউলিপের একজন মুখপাত্র অবশ্য দাবি করেছেন, ওই ফ্ল্যাট বা তার কোনো সম্পত্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কোনো যোগসূত্র থাকার কথা কেউ বললে তা হবে একেবারেই ভুল।

যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে ফিনান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, চলতি শতকের প্রথম দশকে কয়েক বছর কিংস ক্রসের ওই ফ্ল্যাটে ছিলেন টিউলিপ। এমপি হওয়ার পর আয়ের বিবরণীতেও আছে ওই ফ্ল্যাটের তথ্য। অবশ্য হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের ফ্ল্যাটের ভাড়া বাবদ যে অর্থ টিউলিপ পান, সেই তথ্য সম্পদ বিবরণীতে প্রকাশ না করায় গত বছর তাকে সংসদীয় কমিটির প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল।

টিউলিপ লেবার পার্টির সঙ্গে আছেন ১৬ বছর বয়স থেকে। তবে আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ শাখা এবং দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণী কাজেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য দেখা যায় লেবার পার্টির এক ব্লগ পোস্টে। টিউলিপের নির্বাচনী প্রচারাভিযানেও আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখার নেতাকর্মীদের কাজ করতে দেখা গেছে। ২০১৫ সালে শেখ হাসিনার সম্মানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে টিউলিপ বলেছিলেন, আপনাদের সহযোগিতা না পেলে আজ আমি ব্রিটিশ এমপি হতে পারতাম না।

বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুদক যে তদন্ত শুরু করেছে, তাতে শেখ হাসিনার পাশাপাশি টিউলিপের নামও এসেছে। এর মধ্যে উপহারের ফ্ল্যাট নিয়ে উঠল নতুন প্রশ্ন। এতে করে হয়তো মুদ্রা পাচার এবং সন্দেহভাজন অর্থায়ন বন্ধ করা ও দায়িত্ব থেকে টিউলিপকে সরানোর যে দাবি কনজারভেটিভরা তুলেছিল তা আরও জোরালো হতে পারে।

অবশ্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী এখনো টিউলিপের ওপর আস্থা হারাননি। ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য খুবই স্পষ্ট আচরণবিধি রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রেও তা ‘যথাযথভাবে অনুসরণ’ করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ দপ্তরের প্রোপ্রাইটি অ্যান্ড ইথিকস দলের একজন ওই অভিযোগ নিয়ে টিউলিপকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। সেখানে ওই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতির ভাগ্নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত