এভিয়েশনের ১০ কর্মচারী চোরাচালানে জড়িত

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:১৯ এএম

চোরাচালানের ‘গডফাদারদের’ সঙ্গে চুক্তিতে স্বর্ণবার ও বিদেশি মুদ্রাপাচারে সিভিল এভিয়েশনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা জড়িত। বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ওই চক্রে আছে অন্তত দশজন। তারা বিদেশি মুদ্রা এবং স্বর্ণবার বাইরে থেকে নিয়ে বিমানবন্দরে ঢুকিয়ে দিতেন এবং  ভেতর  থেকে বিমানবন্দরের বাইরে পাচার করতেন। গত ১১ ডিসেম্বর রাতে বিমানবন্দর আবাসিকে সংঘটিত সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী মো. ওসমান সিকদার (৪০) হত্যা মামলার তদন্তে এসব তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরের পতেঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) ফরিদুল আলম।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, আদালতে দেওয়া ওসমান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামি সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ইব্রাহিম খলিলের জবানবন্দি, একই মামলায় গ্রেপ্তার আরও দুই আসামিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে চোরাচালানে জড়িত সিভিল এভিয়েশনের উক্ত দশ কর্মচারীর নাম প্রকাশ করেননি তিনি। পাচারের কী পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আত্মসাতকে কেন্দ্র করে ওসমান খুন হয়েছেন তা জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও চোরাচালান গডফাদার দুবাই প্রবাসী রাসেলের মোটা অংকের কুয়েতি দিনার, সৌদি রিয়াল এবং দিরহাম ভিকটিম ওসমান এবং অন্যরা মিলে আত্মসাত করেছেন বলে জানান ওসি (তদন্ত) ফরিদুল আলম।

ওসমান সিকদারকে বিমানবন্দর আবাসিকের বাসাতেই খুন করে খুনিরা সেই স্টেশন ওয়াগন গাড়িতে করেই বিমানবন্দর সংলগ্ন  চরপাড়া সড়কের পাশে ফেলে দেয় বলে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ফরিদুল বলেন, ‘সেই গাড়ির মালিকের নাম আবদুর রহিম। তার বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, তিনি গাড়িটি আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে গাড়িটির মালিকানা এখনো পরিবর্তন করা হয়নি। আমরা সেই মালিককে গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজছি।’ 

এদিকে ওসমান সিকদার হত্যা মামলাটির তদন্ত সংস্থা পরিবর্তনের জন্য মামলার বাদী নিহত ওসমানের বড়ভাই এমরান সিকদার আদালতে আবেদন করেছেন। আবেদনের ওপর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মঙ্গলবার শুনানি হয়েছে। তবে আদালত বর্তমান তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে আন্তরিকতার সঙ্গে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পতেঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) ফরিদুল আলম।

এদিকে ওসমান হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে আসামি ইব্রাহিম খলিল ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিলেও সেই জবানবন্দির কোনো তথ্য বাদী পক্ষকে জানাচ্ছেন না আদালতে নিয়োজিত পতেঙ্গা থানার জিআরও মোরশেদুল আলম। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে জানতে চাইলে জিআরও মোরশেদুল আলম আসামি ইব্রাহিম খলিলের জবানবন্দি পড়ে দেখতে সিএমএম আদালতে করা বাদীর একটি আবেদন দেখিয়ে বলেন, ‘জবানবন্দি কপি দেওয়া তো দূরের কথা। সেটি পড়ে দেখতেও আদালতের নিষেধ আছে।’   

বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর স্বীকার করে বলেছেনÑবিমানবন্দর কেন্দ্রিক চোরাচালান চক্রের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট আছে। হত্যাকান্ডের অনেক আগে আলামত পেয়ে ওসমানসহ (নিহত) আরও কয়েকজনকে শাহ আমানত থেকে সরিয়ে নিতে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি দেন তিনি। কিন্তু ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করে তারা থেকে যান বহাল তবিয়তে। ‘এবার তাদের ছাড় দেওয়া হবে না’ বলেন পরিচালক।

এদিকে ওসমান খুনে গঠিত সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি  তদন্ত কার্যক্রম শেষ করেছে। ঘটনা তদন্তে গিয়ে কমিটি বিমানবন্দরের তৃতীয় ও চতুর্থ  শ্রেণির অন্তত ১০/১২জন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছে। তবে তারা প্রত্যেকেই নিজেদের রক্ষা করতে তদন্ত কমিটির কাছে দায়সারা বক্তব্য দিয়েছেন। আগামী রবিবারের মধ্যে বিমানবন্দর পরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির এক সদস্য।

সুত্রটি জানায়, ৩৭ হাজার নয়, হুন্ডি ব্যবসায়ী দুবাই প্রবাসী মো. রাসেলের ৮৬ হাজার দিনার, রিয়াল ও দিরহাম আত্মসাত করে ফেলার দ্বন্দ্বে খুন হন মো. ওসমান সিকদার। হত্যাকা-ের আড়াইমাস আগে এভিয়েশন কর্মচারী উসমান সিকদারের সঙ্গে শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে মুদ্রাগুলো পাচার করানোর চুক্তি করেন ফটিকছড়ির রাসেল। কিন্তু পরে উসমান রাসেলকে জানান, রিয়ালগুলো বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে নিয়ে গেছেন। ফলে তার কথামতো বিমানবন্দরের অভিবাসন পার হওয়া যাত্রীর হাতে তুলে দিতে পারেননি। এ নিয়ে ভিকটিমের বড়ভাই (মামলার বাদী) রাসেলের সঙ্গে সালিশ দরবারও করেন। কিছু টাকা রাসেলকে ফেরতও দিয়েছিলেন ওসমান। 

এর আগে বিদেশি ৮৬ হাজার মুদ্রা অভিবাসন পার হওয়া যাত্রীর হাতে তুলে না দিয়ে বিমানবন্দরের বাটারফ্লাই পার্ক এলাকায় দুটি গ্রুপের মধ্যে  ভাগবাটোয়ারা করে নেন। এর মধ্যে ভিকটিম ওসমান ও বাদল মজুমদার দুই তৃতিয়াংশ এবং অপর গ্রুপের সদস্যরা পান এক ভাগ। সুত্রটি বলছে, বিদেশি মুদ্রা পাচারের আগে শাহ আমানতে একাধিকবার স্বর্ণ  চোরাচালানে সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম উঠে আসে। গত বছরের ২৯ জানুয়ারি বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এম  জেড এ শরীফকে আটক করা হয়। পরে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাকে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের জিম্মায়  ছেড়ে দেওয়া হয়।

এছাড়া ৮০ পিস স্বর্ণের বারসহ সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী  বেলাল, দেড়শ পিস স্বর্ণের বার পাচারে মেকানিক্যাল শাখার মাহবুবুল আলম ও ক্লিনার হারাধন, এক যাত্রীর লাগেজ তল্লাশি করে ২৫টি স্বর্ণবার উদ্ধারের ঘটনায় এভিয়েশন বিভাগের ব্যবস্থাপকের ব্যক্তিগত সহকারী মোমেন মকসুদ, বিমানের ট্রাফিক  হেলপার নুরুদ্দিনের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় দুদক আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

এদিকে ওসমান সিকদার হত্যায় অংশ নেওয়া চারজন ঘটনার এক মাস পরেও অধরা। হত্যার মূল পরিকল্পাকারী হিসেবে শনাক্ত হওয়া দুবাই প্রবাসী ‘মাফিয়া’ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মো. রাসেল ঘটনার পর পর তিনি দুবাই পালিয়ে গেছেন বলে ইমিগ্রেশন পুলিশ সুত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওসমান খুনের ঘটনায় তার বড়ভাই এমরান সিকদার গত ১২ ডিসেম্বর মো. রাসেল, সিভিল এভিয়েশনের কর্মচারী ইব্রাহিম খলিল ও বাদল মজুমদারকে আসামি করে নগরের পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলা দায়ের হওয়ার আগেই সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ইব্রাহিম খলিল, বাদল মজুমদার এবং আরিফ নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

প্রসঙ্গত, ১১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের ‘চৈতালি’ নামের সরকারি কোয়ার্টারের প্রধান ফটক (জাপানি গেইট) দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকে রাসেলসহ চারজন। ওসমানের কক্ষে ঢুকে তাকে মারধরের এক পর্যায়ে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত দিয়ে খুন করা হয়। ১০ থেকে ১২ মিনিটের ব্যবধানে হত্যাকান্ড ঘটান তারা। এরপর ওসামানের লাশ গাড়িতে তুলে নিয়ে বিমানবন্দরের অদূরে চরপাড়া আউটার রিং রোডের পাশে ফেলে দেয় খুনিরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত