কর-শুল্ক বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:৩৯ এএম

শুল্ক করহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং শিল্পে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির উদ্যোগ অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। গতকাল শনিবার ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের সমসাময়িক অর্থনীতির বিভিন্ন দিক উপস্থাপনকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি সংকটময় মুহূর্ত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার মূল কারণ হলো; সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি খরচ বৃদ্ধি, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণ প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতাসহ উচ্চ সুদহার। তা ছাড়া বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অর্থনীতির বিদ্যমান এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে শতাধিক পণ্যের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু পণ্যের করহার বৃদ্ধি এবং শিল্পে গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর উদ্যোগ আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই সভাপতি অর্থনীতির ১১টি বিষয়বস্তুর ওপর বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরার, পাশাপাশি ২০২৫ সালে ডিসিসিআইর কর্মপরিকল্পনার ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি জানান, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি খরচ বৃদ্ধি, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণ প্রাপ্তিতে বাঁধা ও সুদের উচ্চ হার, উচ্চ শুল্ক হার, ভ্যাট হার বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রভৃতি কারণে দেশের বেসরকারি খাত এমনিতেই বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তিনি জানান, এ বছর ঢাকা চেম্বার সুদের হার কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর অধিক হারে গুরুত্বারোপ করবে।    

এ সময় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন ব্যবসায়ীরা তো সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন, নির্বাচন করছেন। এর জবাবে তাসকীন আহমেদ বলেন, গুটিকয়েক ব্যবসায়ীকে দিয়ে সবাইকে বিচার করা ঠিক হবে না। আমরা মনে করি, ব্যবসায়ীদের শুধু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেই মনোনিবেশ করা উচিত। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আলাদা থাকুক। আর দেশে আইন প্রণয়ন করেন রাজনীতিকরা। আইন ঠিক

থাকলে ব্যবসায়ীরা খারাপ হওয়ার সুযোগ কম পাবেন।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য-সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তাসকীন আহমেদ বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে অস্থিরতা চলছে, সেটিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় বলে মনে করছি। এ কারণে দুই দেশের ব্যবসাতেই কিছু প্রভাব পড়েছে। ফলে ভিসা জটিলতাসহ ব্যবসায়ের অন্য সমস্যাগুলো যত দ্রুত সমাধান হবে, তত দ্রুত দুই দেশের ভালো হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিএসএমই খাতে ঋণ প্রাপ্তি হলেও তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয়, এটি বাড়াতে হবে এবং এ খাতের উদ্যোক্তারা যেন সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ পায় তা নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই, কারণ আমাদের এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে থাকে।

দেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপথ আলাদা থাকা প্রয়োজন জানিয়ে ডিসিসি আই সভাপতি বলেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়ের পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। বর্তমানে অনেক সংস্কারের কথা শুনছি; সামনে নির্বাচনের আলোচনাও রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, অর্থনীতি ও রাজনীতি একই পথে যেন না চলে। রাজনীতি রাজনীতির মতো করে চলুক; সেটি যেন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত না করে।

অন্তর্বর্তী সরকার গৃহীত সংস্কারের উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার দ্রুত এ সংস্কার কার্যক্রম লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সম্পন্ন করবে, বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে এটি আমরা প্রত্যাশা করছি। পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে যদি সরকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও আশাবাদী হবেন এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

নীতির ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সহায়ক কর কাঠামো প্রাপ্তি সাপেক্ষে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন, সে ক্ষেত্রে হঠাৎ মাঝপথে কর কিংবা শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা মোটেই কাম্য নয়, ফলে স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, যা মোটেই কাম্য নয়।

এডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আমরা অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছিলাম, তবে কভিট মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা পরবর্তী সময়ে পটপরিবর্তনসহ আর্থিক খাতে তারল্য সংকটের ফলে এলডিসি উত্তরণ মোকাবিলার প্রস্তুতি বেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় তিনি বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরা কতটা প্রস্তুত তা নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বিশদ আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে। বিষয়টি যদি পেছানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব হয়, তবে দেশের সার্বিক অর্থনীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এলডিসি উত্তরণে আরও কিছুটা সময় নিতে পারে এবং লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কোনো বিকল্প নেই। তবে মনে রাখতে হবে ২০২৬ সালে আমাদের এলডিসি উত্তরণ হলে এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি খাত কে সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এমনিতেই আমাদের জিডিপিতে করের অবদান বেশ কম। এরূপ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছতা সাধনের কোনো বিকল্প নেই বলে ডিসিসিআই সভাপতি মতপ্রকাশ করেন এবং সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ না করা এবং এডিপি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার পাশাপাশি সময় মতো প্রকল্প সমাপ্তিতে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী এবং সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত