এবার বাংলাদেশেও নতুন করে এইচএমপিভি (হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস) আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) নমুনা পরীক্ষা করে ওই রোগীর শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত করেছে। ৩০ বছর বয়সী এই রোগী একজন নারী এবং তার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তবে তিনি নেত্রকোনায় থাকেন ও সেখানেই আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই রোগী গত শুক্রবার ভর্তি হয়েছেন ও তার অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত ৯ জানুয়ারি ওই নারীর শরীরে এইচএমপিভি শনাক্ত হয়। তবে ওই রোগী এইচএমপিভির পাশাপাশি ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ায়ও আক্রান্ত। এই ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়া তৈরি করে। এই ব্যাকটেরিয়ার কারণে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়েছে। বর্তমানে তিনি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে আছে।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, এই রোগীর বিদেশ ভ্রমণের কোনো ইতিহাস নেই। তার স্বামী তিন মাস আগে বিদেশ গেছেন। বিদেশ থেকে গত তিন বছরের মধ্যে তার কোনো ঘনিষ্ঠজন কেউ আসা-যাওয়া করেননি। ওনার বাড়ি কিশোরগঞ্জ, কিন্তু থাকেন শ্বশুরবাড়ি নরসিংদীতে। তিনি নরংসিংদীতেই আক্রান্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর শনাক্ত ভাইরাসটি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ভারতে শনাক্তের পর গত ৮ জানুয়ারি বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সতর্ক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অধিদপ্তর পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। এই ভাইরাস অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো ফ্লু-এর মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। যা সাধারণত ২-৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তাই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে পূর্ব এশিয়ার দেশ চীনে প্রথম এর সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর জাপানে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এখন এইচএমপিভির প্রাদুর্ভাব মালয়েশিয়া ও ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশে শনাক্ত হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যে কোনো বয়সী মানুষের ব্রংকাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো অসুখ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এটি শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল তাদের মধ্যেই বেশি দেখা গেছে।
ভাইরাসটি নতুন নয় : আইইডিসিআর জানিয়েছে, ভাইরাসটি দেশে ২০১৭ সালে প্রথম শনাক্ত হয়। সেই থেকে ভাইরাসটি দেশে ছিল এবং আছে। সর্বশেষ গত বছর এইচএমপিভি আক্রান্ত দুজন শনাক্ত হয়েছিলেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২০০ নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর নমুনা পরীক্ষা করি। সেখানে ২৬ জনের শরীরে এইচএমপিভি পাওয়া গেছে। সুতরাং এটি নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। বাংলাদেশে এটি একটি মৌসুমি ভাইরাস।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন জানান, ভাইরাসটি বাংলাদেশে আগেও ছিল। ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডসে প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও এটা নিয়ে সার্ভে করে ও ভাইরাসটি পেয়েছিল।
এতদিন কেন জানায়নি আইইডিসিআর : ২০১৭ সালে ও তার আগেও বিচ্ছিন্নভাবে ভাইরাসটি দেশে শনাক্ত হলেও সে তথ্য প্রচার করেনি আইইডিসিআর। এর কারণ হিসেবে ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন করে আলোচনায় এলেও ভাইরাসটি নতুন না। এটা কোনো নোটিফাই ডিজিজ না। সচরাচর আছে। আমাদের দেশে ও সারা পৃথিবীতেও আছে। এটা একেবারেই প্রচলিত একটা ঠান্ডা, জ্বর, সর্দিকাশি জাতীয় একটি শ্বাসতন্ত্রের রোগ। পৃথিবীতে অনেক ভাইরাস আছে যেগুলো আমরা খুঁজি না। মূলত যেসব ভাইরাসের জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব আছে সেগুলো খুঁজি। এটা যদি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এটাকে আমরা সার্ভিলেন্সের মধ্যে আনব। এটার সার্ভিলেন্স কোথাও হয় না। এটা সায়েন্টিস্ট ও ভাইরোলজিস্ট আগ্রহ থেকে দেখা হয়। আমাদের দেশে যেসব ভাইরাস জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো খুঁজি।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এতদিন এই ভাইরাস সম্পর্কে আইইডিসিআর কিছু জানায়নি, কারণ জানানোর প্রয়োজন নেই। এবার যেহেতু চীনে শনাক্তের পর রোগটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ আলোচনায় এসেছে, তাই জানানো হলো। অন্যান্য পশ্চিমা দেশের মতো চীনেও যদি কোনো রোগের রোগীর সংখ্যা জরুরি বিভাগের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন তারা একটি অ্যালার্ট জারি করে। এর মাধ্যমে তারা সংশ্লিষ্ট রোগের রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সবাইকে সতর্ক করে দেয়। তবে সেক্ষেত্রে রোগটি যদি অপরিচিত বা নতুন হয়, তখন সবাই সতর্ক হয়। কিন্তু এইচএমপিভি পুরনো ভাইরাস। তবে পুরনো রোগও যদি বেড়ে যায় তখন আমাদের সতর্ক হতে হয়।
তবুও সতর্ক হতে হবে : চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এইচএমপিভি আক্রান্ত হলে জ্বর, সর্দি, কাশি হয়, নাক বন্ধ হয়ে যায়, শরীরে ব্যথা হয়। এটি অন্য জ্বরের মতো। তবে শিশু, বয়স্ক এবং বয়স্ক যেসব ব্যক্তি ক্যানসার বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি আছে। এই ঝুঁকি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার।
এ ব্যাপারে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। যাদের সর্দি কাশি আছে তারা মাস্ক পরে বের হবেন। হাঁচি-কাশিতে আক্রান্তদের থেকে দূরত্ব রাখতে হবে। যদি সর্দি জ্বর হাঁচি-কাশি তিন দিনেও কমে না যায়, তখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কারণ তিন দিনে সাধারণত ভাইরাসের জ্বর কমতে থাকে। কারও ক্ষেত্রে যদি এটা তিন-পাঁচ দিনের মধ্যে না কমে তবে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াল কানাডা
ভ্যাট প্রত্যাহারে একাট্টা সবাই
তিক্ততা মিত্রতায় বিএনপি জামায়াত
স্কুলে ঢুকে শিক্ষককে মারধর!