ফেনীর প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কার্যক্রম পরিচালনায় উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীরা দায়িত্ব পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। তবে ইদানীং জনবল সংকটে এ কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। ফেনীর ছয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারী ২০৫টি পদের মধ্যে ১১৮টি পদই শূন্য রয়েছে। পদ শূন্যতার কারণে ফেনীতে ওয়ার্ড পর্যায়ে একজন স্বাস্থ্য সহকারীকে নিজ কর্ম এলাকার পাশাপাশি প্রতিনিয়তই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীরা।
জানা যায়, শিশু ও নারীদের বিভিন্ন মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য সরকার ইপিআই অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশু, কিশোরী ও নারীদের ১১টি মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর, লেমুয়া, ছনুয়া, মোটবী, কালীদহ ও ধর্মপুর ইউপিতে স্বাস্থ্য সহকারী পদ শূন্য থাকায় পাশের ইউনিয়নে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকরা শিডিউল ভিত্তিতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১০ সালের পর স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগের জন্য ২০১৫, ২০১৯ ও ২০২৪ সালে তিন দফা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও, দীর্ঘ ১৪ বছরেও নিয়োগ হয়নি স্বাস্থ্য সহকারী। এ ছাড়া অবসরজনিত কারণে দিন দিন পদ শূন্যতা বাড়ছে। ফলে প্রান্তিক মানুষের ইপিআই ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম চলছে জোড়াতালি দিয়ে। ফেনীর ছয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়নে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৮৭ স্বাস্থ্য সহকারী। এর মধ্যে সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে প্রেষণে রয়েছেন কয়েকজন।
ফেনী সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার সদর উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারীর মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ৫৯টি, কর্মরত আছে ২৫ জন, শূন্য পদ রয়েছে ৩৪টি। দাগনভূঞা উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারীর মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ৩৯টি, কর্মরত আছে ১৭ জন, পদশূন্য ২২টি। সোনাগাজী উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারীর পদ রয়েছে ৪৪টি, কর্মরত ২২ জন, শূন্য রয়েছে ২২টি। ছাগলনাইয়া উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারীর মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ২৯টি, কর্মরত আটজন, শূন্য পদ ২১টি। ফুলগাজীতে স্বাস্থ্য সহকারীর পদ রয়েছে ১৪টি, কর্মরত ছয়জন, শূন্য পদ আটটি। পরশুরাম উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারীর পদ ২০টি, কর্মরত ৯ জন, শূন্যপদ ১১টি। নিয়ম অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সহকারীরা দুদিন ইপিআই, দুদিন কমিউনিটি ক্লিনিক এবং দুদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সপ্তাহের ছয় দিন নিজ কর্মরত এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু স্বাস্থ্য সহকারী পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ছে বলে জানান এলাকাবাসী।
কালীদহ ইউনিয়নের কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, স্বাস্থ্য সহকারীরা নিজ নিজ কর্মস্থল ছাড়াও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাড়তি কোনো আর্থিক সুবিধাতো পান না। বরং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজ বেতনের অনেক টাকাই অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে যায়।
শর্শদী ও ছনুয়া ইউপির দায়িত্বে থাকা সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক গোলাম সরওয়ার জানান, স্বাস্থ্য সহকারীরা তাদের দায়িত্ব পালনে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে জনবলের অভাবে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে।
ফেনী সদর উপজেলার স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ে পদ শূন্য থাকায় সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগগুলো দেখা দিলে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বেগ পেতে হয়। তারপরও কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীরা তাদের নিয়মিত দায়িত্ব হিসেবে ইপিআই, এইচপিভি টিকা, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন, কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত বিভিন্ন দুর্যোগকালীন নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
ফেনী সদর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এসএসআর মাসুদ রানা বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে শূন্যতার কারণে রুটিন মাফিক ইপিআইসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় অনেক কষ্ট হচ্ছে। তারপরও আমাদের আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি।’
ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে স্বাস্থ্য সহকারীর পদ শূন্যতার কারণে স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনায় অসুবিধার কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। জনবল নিয়োগ হলে সংকট কেটে যাবে বলে আশা করছি।’
