গোখাদ্য হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে নিম্নমানের চিনি। পরে এসব চিনি মেশানো হচ্ছে খেজুর গুড়ে। রাজশাহীর কয়েকটি উপজেলার খেজুর গুড়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এমন অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
সূত্র বলছে, বাড়তি লাভের আশায় গোখাদ্যের নিম্নমানের চিনি গুড়ে মিশাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আবার এসব গুড়ের উজ্জ্বলতা বাড়াতে মেশানো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব তথ্য জানাজানি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ অঞ্চলের গুড় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের একটি সূত্রের তথ্য থেকে জানা গেছে, বছরের অন্য সময় ভারতীয় নিম্নমানের চিনির (গোখাদ্য) যে চাহিদা থাকে, শীতের তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। গত বছরের নভেম্বরে এই চিনি অমদানি করা হয়েছে ৩০০ ট্রাক। প্রতিটি ট্রাকে চিনি থাকে ৪০ টন করে। সেই হিসাবে আমদানি করা হয়েছে ১২ হাজার টন। ডিসেম্বরে সেটি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ৬০০ গাড়ি, অর্থাৎ ২৪ হাজার টন। চলতি বছরের জানুয়ারির ১১ দিনে আমদানি করা হয়েছে ১৪০ গাড়ি, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ৬০০ টন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা বাড়ার কারণে জানুয়ারিতে আমদানি গত দুই মাসের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ১১ লাখ ৮ হাজার খেজুরগাছ রয়েছে। একটি গাছে যে রস হয়, তা থেকে ৮ কেজির মতো গুড় হয়। সে হিসাবে মোট গুড়ের উৎপাদন হতে পারে ৮৮ লাখ ৬৪ হাজার কেজি। আর এর বিক্রয় মূল্য হবে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
সম্প্রতি রাজশাহীর বানেশ্বর উপজেলার একটি গুড় তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, গুড় তৈরির জন্য চুলায় জ্বাল দেওয়া হচ্ছে খেজুরের রস। কিছুটা গরম হলেই তাতে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে গোখাদ্যের নামে আনা নিম্নমানের টিনজাত চিনি। গুড়ের ঘনত্ব বাড়াতে দেওয়া হচ্ছে ডালডা আর আটা। দেখতে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য হাইড্রোজ ও রঙ।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক কারিগর জানান, গুড় তৈরি করতে হাইড্রোজ, ডালডার পাশাপাশি চুন, ফিটকিরিও ব্যবহার করা হয়। শুধু বানেশ্বর নয়, পুঠিয়া, দূর্গাপুর, চারঘাট, বাঘা উপজেলার অনেক কৃষকবাড়ি ও আড়তে চলছে এমন ভেজাল গুড় তৈরির কারবার। নজরদারি না থাকায় ভেজাল গুড় তৈরি-বাজারজাত করতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না কারিগর-ব্যবসায়ীদের।
রাজশাহীর নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘গত বছর আমরা গুড় কতটা নিরাপদ, তা জানতে বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু গুড় সংগ্রহ করেছিলাম। তাতে দেখা গেছে, কোনো গুড়ই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এসব গুড়ে ফিটকিরি ও ডিটারজেন্ট পাওয়া গেয়েছিল। এ বছর আমরা পরীক্ষা এখনো শুরু করতে পারিনি। তবে শিগগিরই আমরা ফলোআপের জন্য নমুনা সংগ্রহ করব।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ডা. মাহবুববুর রহমান খান বাদশা বলেন, ‘এগুলো আমাদের শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। এ ধরনের গুড় খাওয়ার পর খাদ্যনালি ও পাকস্থলীতে আলসার ও ক্যানসার হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুড়ের মধ্যে ব্যবহার করা হাইড্রোজ সবচেয়ে ভয়ংকর ও ক্ষতিকর। হাইড্রোজের ফলে মানবদেহে ক্যানসার ও কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর।’
ভেজাল গুড়ের কারবারে কৃষকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. উম্মে ছালমা। তিনি বলেন, ‘এমন অনিয়ম কৃষক পর্যায়ে নেই বললেই চলে। যারা ব্যবসা করে, তারা এসব করলে করতে পারে। কৃষকরা যে গুড় তৈরি করছেন, সেই গুড় শতভাগ নির্ভেজাল।’
