বিস্ফোরক মামলায় জামিন দুই শতাধিক আসামির

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

১৬ বছর আগে রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে সংঘটিত হত্যাকান্ডের ঘটনার পর করা বিস্ফোরক মামলায় দুই শতাধিক আসামি জামিন পেলেন। হত্যা মামলায় অধস্তন ও উচ্চ আদালতে খালাসপ্রাপ্ত এবং যাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল হয়নি তাদের জামিন হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। আসামিপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে ঢাকা মহানগর প্রথম অতিরিক্ত দায়রা আদালতের বিচারক মো. ইব্রাহীম মিয়া গতকাল রবিবার এ আদেশ দেন।

বিস্ফোরক মামলার বিচারকাজ চলছে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতের এজলাসে। ঘটনার পর হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় এই প্রথম কোনো আসামিরা জামিন পেলেন। গতকাল জামিনের আদেশের পাশাপাশি এ মামলায় ২৮৪তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মেজর সৈয়দ মো. ইউসুফ।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দুদিন পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নামে নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহত হন আরও ১৭ জন। ২০১০ সাল থেকে বিস্ফোরক মামলাটির বিচারকাজ চলছিল রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে। গত ৯ জানুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামিদের জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে এর আগের দিন সেখানে আদালতের কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নামেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। রাতে অস্থায়ী এজলাসে ভাঙচুর ও অগ্নিকান্ড ঘটে। শুনানির দিন (৯ জানুয়ারি) সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা পরিস্থিতি দেখে এখানে বিচারকাজ সম্ভব নয় বলে জানান। পরে বিচারক শুনানির জন্য ১৯ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। পরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক গেজেটে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অস্থায়ী এজলাসে বিস্ফোরক মামলার বিচারকাজ চলবে বলে জানানো হয়।

এর ধারাবাহিকতায় গতকাল শুনানি শেষে আদেশ আসে। আদালতে আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম, ফারুক আহাম্মদ, মোহাম্মদ পারভেজ খান প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করে শুনানি করেন এ মামলার প্রধান কৌঁসুলি মো. বোরহান উদ্দিন। বিস্ফোরক ১২০ আসামির পক্ষে জামিনের আবেদন করেছিলেন অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ঘটনার মূল মামলায় (হত্যা মামলা) আসামিরা (বিস্ফোরক মামলা) আরও আগেই খালাস পেয়েছেন। ১৬ বছরে ১ হাজার ৩০০ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র পৌনে তিনশ সাক্ষী হাজির করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ মামলা সহসাই নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অথচ যারা হত্যা মামলায় খালাস পেয়েছিলেন, তারা প্রায় ১৬ বছর ধরে কারাগারে আছেন আদালতে এসব যুক্তি তুলে ধরার পর আদালত জামিন মঞ্জুর করেছেন।’

এ আইনজীবী আরও জানান, আসামি যেহেতু বেশি তাই জামিনের আদেশনামা পাওয়ার পর জামিননামা (বেইল বন্ড) দাখিল করতে আরও দুয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এ প্রক্রিয়া শেষে আসামিরা কারামুক্ত হবেন।

পিলখানায় হত্যাকান্ডের ঘটনায় অভিযোগপত্রে আসামি করা হয় ৮২৯ জনকে। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১৬০ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড। ২৫৬ আসামিকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন। এরপর ফাঁসির আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন), আপিল, জেল আপিল, অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল নিষ্পত্তি করে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর দুদিন হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ রায়ে বিচারিক আদালতে ফাঁসির সাজা পাওয়া ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ আসামির দন্ড বহাল রাখে। এ ছাড়া আটজনকে মৃত্যুদন্ড থেকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাবাসের। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পাঁচজনকে খালাসের রায় দেওয়া হয়। আর বিচারিক আদালতে ১৬০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে হাইকোর্টে ১৪৬ জনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল থাকে। এ সাজা থেকে খালাস দেওয়া হয় ১৪ জনকে। এ ছাড়া বিচারিক আদালতে ৬৯ জনের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টে ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন সাজার রায় হয়।

উচ্চ আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ে ৬৩ জন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামির পক্ষে আপিল বিভাগে ৩৫টি আপিল করা হয়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১৩২ জনের পক্ষে ২৯টি আপিল করা হয়। অন্যদিকে হাইকোর্টে খালাস পাওয়া এবং এবং মৃত্যুদন্ড থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে এমন ৮৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০টি আপিল দায়ের করে।

আইনজীবীরা জানান, বিচারিক আদালত থেকে খালাস পাওয়া ২৭৮ জনের মধ্যে হাইকোর্টে যাদের ১০ বছর পর্যন্ত সাজা ছিল তাদের সাজা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় হত্যা মামলায় খালাসপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ২৫৬ জন। তবে তারা সবাই বিস্ফোরক মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে আছেন। এর মধ্যে প্রায় সবাই গতকাল অধস্তন আদালতের রায়ে খালাস পেলেন বলে জানান আইনজীবীরা। বিস্ফোরক মামলায় তদন্ত শেষে ২০১০ সালের ২৭ জুন অভিযোগ গঠন করে ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ১ হাজার ৩৫৭ জনকে। ইতিমধ্যে পৌনে তিনশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত