বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে একের পর এক পাল্টা বক্তব্য আসছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কাছ থেকে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এরই মধ্যে গত শুক্রবার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে বিএনপির কথার টোন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে যায়।’ তার এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেছেন, ‘সরকারের সমালোচনা করলে তাদের তা সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাদের সফল করার লক্ষ্যে আমরা সমালোচনা করি। এগুলো তাদের হজম করতে হবে। বাকস্বাধীনতার অধিকার দিতে হবে। কিন্তু সমালোচনা করলে পরবর্তীতে নেতাকর্মীদের অপমান করা হয়।’
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য উপদেষ্টাদের মতো হবে না। কারণ সবারই পৃথক রাজনীতি আছে। কেউ আমরা শত্রু নই। তাই কেউ কিছু বললে তা নিয়ে অন্য দলের সঙ্গে ট্যাগ লাগানো ঠিক হবে না। এ ধরনের সরলীকরণ বিপজ্জনক হতে পারে।’
এর আগে গত শুক্রবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকার নিয়ে বিএনপির কথার টোন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সে কিন্তু স্ট্যাটাস দিয়েছে যে, এটা অবৈধ ও অনির্বাচিত সরকার, একটা নিরপেক্ষ সরকার লাগবে, এর আন্ডারে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব না। সো একই টোনে আমরা যখন কথা বলতে দেখছি, এটা কিন্তু একটা সন্দেহের তৈরি করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না যে এটা তারা (বিএনপি) ওই উদ্দেশ্য থেকে বলেছে, কিন্তু তাদের কথার টোনটা কিন্তু আওয়ামী লীগের সেই টোনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারলে নির্বাচন করতে পারবে না। নির্বাচনে নিরপেক্ষ সরকারের দরকার।’ দুদিন পর এর প্রতিক্রিয়ায় উপদেষ্টা নাহিদ ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লেখেন, “বিএনপি মহাসচিবের ‘নিরপেক্ষ সরকারের’ দাবি মূলত আরেকটা ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। ওয়ান-ইলেভেনের বন্দোবস্ত থেকেই আওয়ামী ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে সামনে আরেকটা ওয়ান-ইলেভেনের সরকার, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং গুম-খুন ও জুলাই হত্যাকা-ের বিচার না হওয়ার আলামত রয়েছে।”
সবশেষ গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেছেন, ‘সরকারের সমালোচনা করলে তাদের তা সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাদের সফল করার লক্ষ্যে আমরা সমালোচনা করি। এগুলো তাদের হজম করতে হবে। বাকস্বাধীনতার অধিকার দিতে হবে। কিন্তু সমালোচনা করলে পরবর্তীতে নেতাকর্মীদের অপমান করা হয়।’
জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা আয়োজিত ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভূমিকা শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘আপনাদের মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমালোচনা করা যেত না। বাকস্বাধীনতা ছিল না। সমালোচনা করলেই জেলজুলুম করা হতো। তাদের শাসনামলে মানবাধিকার থাকেনি। ফেসবুকে লিখলে পুলিশ বাড়িতে এসে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। হামলা-মামলা, গুম-খুন ছিল মুক্তমত দমনের হাতিয়ার।’
সেলিমা রহমান আরও বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই ছিল মানবাধিকার ফিরে পাওয়া। ছাত্র-জনতা আন্দোলন করেছে, শহীদ হয়েছে। তাছাড়া এই আন্দোলনে বিএনপির লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষ যেন গণতন্ত্র ফিরে পায়। তাই আমাদের প্রায় ৫০০ নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন।’
রাজনৈতিক অঙ্গনে চলা পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবার রাজনীতি এক নয়। তাই বক্তব্যে ভিন্নতা থাকতে পারে। তাই বলে কাউকে অন্যদের সঙ্গে ট্যাগ করা ঠিক হবে না। সরলীকরণ করা বিপজ্জনক হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অযথা প্রশ্ন ওঠানো হলে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব বাড়তে পারে। আমরা দূরত্ব বাড়াতে চাই না। আমরা বোঝাপড়া ও সমঝোতা রাখতে চাই। বক্তব্যে ভিন্নতা থাকবেই। তাই বলে সম্পর্ক নষ্ট হয় এমন কিছু করা যাবে না। রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও ঐক্য রাখা দরকার।’
