লাতিন আমেরিকার গল্পে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া যেন অমোঘ। তেমনই এক রূপকথার চরিত্র ভ্যালেন্তিনো আকুনিয়া। এক দশক আগে আর্জেন্টাইন চিত্রপরিচালক অ্যালেক্স দে লা ইগলেসিয়ার ‘মেসি’ প্রামাণ্যচিত্রে লিওনেল মেসির শৈশবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন এই ফুটবলার। কিন্তু তখনো কে জানত, সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন মাঠে ‘বাস্তবের মেসি’র মতো পারফর্ম করবেন!
ইগলেসিয়া তার ‘মেসি’ প্রামাণ্যচিত্রের শৈশব-অংশে মেসির ‘বডি-ডাবল’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আকুনিয়াকে। বাঁ পায়ের ড্রিবলিং আর বল নিয়ন্ত্রণে আকুনিয়ার দক্ষতা যেন শৈশবের মেসিকেই মনে করিয়ে দিত। তাই ওই সিনেমায় দেখা যায়নি আকুনিয়ার মুখ। তবে তার বাঁ পা আর শরীরী ভাষাই মূর্ত করেছিল ছোট্ট মেসিকে।
মেসির শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজেই ফুটবলের হাতেখড়ি হয় আকুনিয়ার। শুরুতে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলা আকুনিয়া পরে কোচের সিদ্ধান্তে মাঝমাঠে খেলা শুরু করেন। এখানেই তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন। ২০২২ সালে নিউয়েলসের সঙ্গে প্রথম পেশাদার চুক্তি করেন এই মিডফিল্ডার।
২০২৩ সালে দক্ষিণ আমেরিকার অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে আর্জেন্টিনার হয়ে আলো ছড়ান আকুনিয়া। ইন্দোনেশিয়ায় অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপেও নিজের প্রতিভা দেখান। বিশেষ করে জাপানের বিপক্ষে গোল করার পর তার উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছিল। সেই গোল নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পরিবারের উপস্থিতিতে এই জার্সি পরে বিশ্বকাপে গোল করার মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না।’
সব অর্জন ছাপিয়ে আকুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি আসে চলমান দক্ষিণ আমেরিকার অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে। ব্রাজিলকে ৬–০ গোলে বিধ্বস্ত করা ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম দুটি গোলের মূল কারিগর ছিলেন আকুনিয়া। তার দারুণ দক্ষতায় উঠে আসে সেই মুহূর্তগুলো, যা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে মেসির মতোই ম্যাজিক।
মেসি হওয়ার স্বপ্ন, তবে নিজের পরিচয় নিয়েই এগোতে চান
আকুনিয়ার বাবা গুস্তাভো বলেন, 'লিওনেল মেসি তার একমাত্র আদর্শ। তবে আমি তাকে বলেছি, মেসি বা মারাদোনা কেউই আর হবে না। নিজের মতো করেই খেলতে হবে।'
আকুনিয়ার পা যেন সবসময় মাটিতে থাকে সেদিকে তার বাবা সবসময় খেয়াল রাখেন। পরিশ্রম করে উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। গুস্তাভোর কাছে, মাঠে ছেলের দক্ষতার চেয়েও বেশি গর্ব করার মতো বিষয় হলো আকুনিয়ার চরিত্র ও স্বভাব।
এ বিষয়ে ইনফোবিকে তিনি বলেন, 'যখন কোনো দশ বছর বয়সী ভালো খেলে, তখন লোকে বলে সে নতুন মেসি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আরেকজন মেসি বা ম্যারাডোনা আর কখনো হবে না। আমরা অনেক দক্ষ ফুটবলার খুঁজে পাব, কিন্তু লিওনেল বা দিয়েগোর মতো কেউ ২০ বা ৩০ বছর পর পর জন্মায়।'
যে ছেলেটি একসময় মেসির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, সেই আকুনিয়া আজ বাস্তবে মেসির মতোই আর্জেন্টিনার ফুটবলে আলো ছড়াচ্ছেন। তবে মেসি হওয়ার চেয়ে আকুনিয়ার যাত্রা এখন নিজেকে একজন সফল ফুটবলার হিসেবে প্রমাণ করার দিকে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই জাদুবাস্তবতার একটি পূর্ণ চক্র অতিক্রম করেছেন আকুনিয়া। মেসির শহরে জন্ম, মেসির ক্লাবে ফুটবলের শুরু, মেসির চরিত্রে অভিনয় এবং এখন মেসির মতোই মাঠে জাদু দেখানো—সব মিলিয়ে আকুনিয়ার যাত্রা যেন এক রূপকথার চেয়ে কম নয়। তবে এই গল্প এখনো শেষ হয়নি। আকুনিয়ার সামনে রয়েছে আরও বিস্ময়কর অধ্যায় লেখার সুযোগ।
অপেক্ষা এখন আকুনিয়ার স্বপ্নপূরণের ধারাবাহিকতার। তিনি কি সত্যিই পরবর্তী মেসি হয়ে উঠতে পারবেন? ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে সেদিকেই।
ইউরোপের যে মাঠ মুগ্ধ করেছিল মেসি-রোনালদোকে