ঐক্যবদ্ধ হলে বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:১২ এএম

কাতার প্রবাসী হাফেজ সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ময়মনসিংহের এই কৃতী সন্তান হাফেজদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত ইবনে খালদুন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। সারা দেশে বিশুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখানো, দ্বীনি মাহফিলের আয়োজন, অসহায় ও দুস্থদের সেবায় কাজ করে থাকে সংগঠনটি। হাফেজদের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আতিকুর রহমান

দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান কোরআনের হাফেজ আপনি। বর্তমানে অনেক হাফেজ বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। তাদের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?

সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান : আমি একজন আন্তর্জাতিক হাফেজ হিসেবে বর্তমান সময়ের হাফেজদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করি। তা হলো, কোরআন তেলাওয়াতের গুণগত মান। অর্থাৎ কোরআন তেলাওয়াতের স্বর, উচ্চারণ, তাজবিদ এবং কোরআনের মূল অর্থের ওপর জোর দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা নিপুণতা অর্জন করেছে, সেটি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সেই সঙ্গে ইসলামি জ্ঞান অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কিত জ্ঞানের গভীরতা, ইসলামের বিধানাবলি সম্পর্কে সঠিক বুঝ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি কতটা বিস্তৃত, সেটি মূল্যায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিও এ ক্ষেত্রে দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের পরিস্থিতি, মুসলিম সম্প্রদায়ের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতা এবং বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর জন্য কাজ করার মনোভাব। একজন হাফেজের শুধু কোরআন মুখস্থ করাই যথেষ্ট নয়। তাকে ইসলামের একজন সফল দাঈ হতে হলে ওপরে উল্লিখিত গুণাবলি অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। আর বর্তমান সময়ে হাফেজদের মধ্যে আমি যেসব ইতিবাচক দিক লক্ষ করি, সেগুলোর কয়েকটি হলো, আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে হাফেজরা বেশ সক্রিয়।

দেশ রূপান্তর : বিশ্বজয়ী হাফেজদের বেশির ভাগই পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যান। তাদের দ্বারা দেশ ও জাতি আশানুরূপ উপকৃত হতে পারে না। এর কারণ কী বলে মনে করেন আপনি?

সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান : আপনি যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তার বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া হাফেজরা পরবর্তী সময়ে কীভাবে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগাচ্ছেন, এটি সত্যিই জানার বিষয়। এমন কিছু কারণ থাকতে পারে, যে কারণে কেউ কেউ হারিয়ে যেতে পারেন, এর কয়েকটি হলো শিক্ষা ও কর্মজীবন অর্থাৎ অনেকে হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য বা কর্মজীবনের প্রয়োজনে কোরআন শিক্ষা থেকে কিছুটা দূরে সরে যেতে পারেন। সেই সঙ্গে সামাজিক চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা বা অন্যান্য কারণে তারা কোরআন শিক্ষাকে প্রাধান্য নাও দিতে পারেন। এছাড়া আর্থিক সমস্যাও অন্যতম কারণ। এ কারণে তারা কোরআন শিক্ষা ও প্রচারের কাজে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করতে নাও পারতে পারেন। এর বাইরে ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা ইত্যাদি কারণেও কেউ কেউ কোরআন শিক্ষা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন হাফেজদের জন্য আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে তারা তাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারেন। তাদের কোরআন শিক্ষা ও প্রচারের কাজে উৎসাহিত করা এবং প্রেরণা দেওয়া। আর্থিকভাবে অসচ্ছল হাফেজদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। সমাজের পক্ষ থেকে হাফেজদের সমর্থন দেওয়া ইত্যাদি। আমি মনে করি, একজন হাফেজ হিসেবে দায়িত্ব হলো, নিজের জ্ঞানকে ক্রমাগত বিকশিত করা। অন্যদের কোরআন শিক্ষা দেওয়া। ইসলামের বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যথাসম্ভব সমাজের সেবা করা।

দেশ রূপান্তর : হাফেজদের ঐক্যবদ্ধ করতে ইবনে খালদুন ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান : বাংলাদেশের কোরআনের হাফেজদের একত্র করার লক্ষ্যে ইবনে খালদুন ফাউন্ডেশন নামে সংগঠনটির নেতৃত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আমি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আসলেই আমার জীবনে অনেক দিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি হাফেজদের একত্র করার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছি, একতা অনেক বড় শক্তি। একত্র হয়ে আমরা অনেক বড় লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। এছাড়া হাফেজদের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে পেরেছি এবং সেগুলোর সমাধানের জন্য কাজ করেছি। এর মাধ্যমে হাজার হাজার হাফেজের আস্থা অর্জন করে তাদের সেবা করার মধ্য দিয়ে আমার দায়িত্ববোধ আরও বেড়েছে। হাফেজদের মাধ্যমে সমাজসেবা করার বিভিন্ন সুযোগ পেয়েছি।

দেশ রূপান্তর : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আপনার ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন দেশের আলেমদের সঙ্গে মিশেছেন। সেই আলোকে বাংলাদেশের আলেম-ওলামার কোন বিষয়টির ঘাটতি আছে বলে মনে করেন?

সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান : বিষয়টি সংক্ষেপে বলা কঠিন। এটা দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। বেশ কিছু বিষয়েই ঘাটতি দেখেছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো, আধুনিক জ্ঞানের অভাব। সেই সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতার অভাবও রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভাষা যেমন আরবি বা ইংরেজিতে দক্ষ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের মতামত তুলে ধরতে পারছেন না। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতার অভাবও রয়েছে। আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার না জানার কারণে অনেক আলেম-ওলামা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না।

দেশ রূপন্তর : বর্তমান সময়ে একজন দাঈর কী কী গুণ থাকা জরুরি বলে মনে করেন?

সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান : বর্তমান সময়ে একজন দাঈর জন্য বেশ কিছু গুণ থাকা অত্যন্ত জরুরি। সমাজের চাহিদা ও পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য যেই গুণগুলো অপরিহার্য। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইসলাম শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন আধুনিক বিষয়ের জ্ঞান থাকা। এতে তিনি সমসাময়িক সমস্যাগুলোকে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের অবস্থান, মুসলিম সম্প্রদায়ের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। আর ভাষার দক্ষতাও বড় একটি বিষয়। অন্তত একটি আন্তর্জাতিক ভাষা যেমন আরবি বা ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের বড় বড় আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এর বাইরে বিভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করা এবং অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতা করার মনোভাব থাকা জরুরি। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া একজন দাঈর মধ্যে ইমানদারি, আন্তরিকতা, বিচক্ষণতা, সহানুভূতি ও ধৈর্য থাকা উচিত।

দেশ রূপান্তর : এখনকার তরুণদের মধ্যে হতাশা কাজ করে। উত্তরণের পথ কী?

সাইয়্যেদ মাহফুজুর রহমান : বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে হতাশার প্রবণতা বেড়ে চলেছে, এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়। এই হতাশার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক চাপ তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। সেই সঙ্গে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার তীব্রতা তরুণদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তরুণদের মনে ভয় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। আরেকটি বিষয় হলো মাদকাসক্তি। এটাও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি। হতাশার প্রভাবে শিক্ষায় মনোযোগ দিতে পারে না। তারা নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলে। ফলে চরম হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কেউ কেউ আবার নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যায়। এজন্য শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত