বাজল বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৪৭ এএম

পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কানাডা, মেক্সিকো ও চীন থেকে আমদানি করা পণ্যে মোটা অঙ্কের শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ মতে, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকেই ওই তিন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যে চালু হতে যাচ্ছে এই শুল্ক। তবে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে দেশটি থেকে আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা ও মেক্সিকো। অন্যদিকে শুল্ক আরোপের পাল্টা জবাবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় নালিশ জানাবে চীন। এমন পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ঘোষণা বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশে^র সবচেয়ে বড় স্থল সীমান্তের অধিকারী দুই মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক এই পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের কারণে আরও অবনতি হয়েছে। গত শনিবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এক সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকানদের সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের কারণে তাদের পরিণতি ভালো হবে না। ট্রুডো জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ১৫৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। এর মধ্যে ট্রাম্প ঘোষিত শুল্ক আরোপের দিন থেকেই অর্থাৎ আগামী মঙ্গলবার থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক কার্যকর হবে। অন্যদিকে বাকি ১২৫ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কার্যকর হবে আগামী ২১ দিনের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ঢালাওভাবে কানাডা এবং মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্যের আড়ালে অবৈধ মাদক কারবারি এবং অবৈধ অভিবাসীদের প্রবেশের অভিযোগ করেছেন। এরপরই তিনি কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ এবং চীন থেকে আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প জানান, তিনি কানাডা থেকে আমদানি করা সমস্ত জ¦ালানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিয়ার, ওয়াইন ও বারবন আসবে। এর পাশাপাশি ফল ও ফলের জুস, যার মধ্যে ট্রাম্পের নিজ রাজ্য ফ্লোরিডার কমলার জুসও এ শুল্কের আওতায় পড়বে। এ ছাড়া কানাডা আরও যেসব পণ্যকে লক্ষ্যবস্তু করবে, তার মধ্যে রয়েছে পোশাক, ক্রীড়াসামগ্রী এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি। ট্রুডো বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ কানাডার জন্য কঠিন হতে পারে, তবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের কারণে আমেরিকানরাও ভোগান্তির শিকার হবেন।

অটোয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে ট্রুডো বলেন, কানাডার বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ আপনার চাকরিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। কারণ এ শুল্কের কারণে মার্কিন অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট এবং অন্যান্য উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে মুদি দোকানের খাদ্যপণ্য ও পেট্রোল পাম্পের জ¦ালানির দাম বাড়বে, যা আপনার ব্যয়ও বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, কানাডা শুল্কবহির্ভূত পদক্ষেপের বিষয়ে বিবেচনা করছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ¦ালানি সংগ্রহ এবং অন্যান্য অংশীদারত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

কানাডার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বাণিজ্য হয়েছে। বিশেষ করে জ¦ালানি ও উৎপাদন খাতে বাণিজ্য হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানি করেছে, যা দেশটির রপ্তানির তিন-চতুর্থাংশের বেশি। এই রপ্তানির মধ্যে জ¦ালানি খাতে অবদান ছিল ৩০ শতাংশ এবং উৎপাদন শিল্পের অবদান ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। কানাডা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশই রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে এবং এর সঙ্গে ২৪ লাখের বেশি লোক এসব কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের খড়্গ এমন সময় কানাডার ওপর এসেছে, যখন দেশটি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল পার্টির মধ্যেও নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপের প্রতিক্রিয়ায় মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও পাল্টা শুল্ক বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে শেইনবাউম বলেছেন, ‘তার সরকার উত্তর আমেরিকায় মেক্সিকোর শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সংঘাত নয়, আলোচনাই চেয়েছিল, কিন্তু মেক্সিকোকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, মেক্সিকোর স্বার্থ সুরক্ষায় শুল্ক এবং শুল্কবহির্ভূত নানা পদক্ষেপ মিলিয়ে যে প্ল্যান বি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম, তা বাস্তবায়নে আমি অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছি।’

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট অবশ্য তার পাল্টা ব্যবস্থার খড়্গ কোন কোন মার্কিন পণ্যের ওপর পড়বে, তা খোলাসা করেননি। তবে এ বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, শূকরের মাংস, চিজ, টাটকা ফল-সবজি, প্রক্রিয়াজাত ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যে ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে মেক্সিকো।

এদিকে চীন গতকাল ঘোষণা করেছে, তারা বেইজিংয়ের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে ‘জোর আপত্তি জানাচ্ছে’ এবং তারা তাদের ‘নিজস্ব অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত করতে উপযুক্ত পাল্টা ব্যবস্থা নেবে’। বেইজিং থেকে এএফপি জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ব্যবস্থা ঘোষণা করে চীনা আমদানি পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের আরও ১০ শতাংশ বেশি শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দেন।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনের ‘ভুল কর্মকাণ্ডের’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বেইজিং ‘এটি নিয়ে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট এবং তারা এর বিরুদ্ধে দৃঢ় আপত্তি জানাচ্ছে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্ক আরোপ ডব্লিউটিওর নিয়মাবলির মারাত্মক লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে জানায়, এ নিয়ে বেইজিং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) মামলা করবে। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এই শুল্ক ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সমস্যাবলি সমাধান করতে সহায়ক হবে না, বরং এটি সাধারণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘চীন আশা করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মুহূর্তে শুল্ক দিয়ে অন্য দেশগুলোকে হুমকি না দিয়ে বরং তার নিজের সমস্যা যেমন ফেন্টানিল ইত্যাদি যথাযথ ও যুক্তিসংগতভাবে মোকাবিলা করবে।’

এক পৃথক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ বা শুল্কযুদ্ধের মধ্যে কেউ জয়ী হয় না।’ মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের এই পদ্ধতি গঠনমূলক নয় এবং এটি অনিবার্যভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, শুল্ক লড়াইয়ের এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছে, এখানেই থামছেন না তিনি। মার্কিন বাণিজ্যের স্বার্থে আরও পদক্ষেপ নেবেন আগামীতে। এ সপ্তাহেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর পণ্যে শুল্ক বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। পাশাপাশি, সেমি-কন্ডাক্টর, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তেল ও গ্যাস আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। হোয়াইট হাউজ বলেছে, ‘জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে ও আলোচনার টেবিলে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে শক্তিশালী ও উপযোগী উপকরণ হলো শুল্ক আরোপ করা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত