হিজরি বর্ষের অষ্টম মাস শাবান। পরবর্তী মাস রমজান। রমজানকে বলা হয় ইবাদতের মাস। তাই শাবান মাস এলেই চারদিকে ইবাদতের সুবাতাস বইতে শুরু করে। জেগে ওঠে মুমিনের হৃদয়। তারা বিনীদ্র রজনী যাপন করেন প্রভুপ্রেমে। ইবাদত-বন্দেগিতে কাটান দিনের বেশিরভাগ সময়। আসছে রমজানের প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে মানসিকভাবে গড়ে তোলার অপূর্ব সুযোগ শাবান মাস। হাদিসের আলোকে এ মাস অত্যন্ত ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। এ মাসে মুসলিম উন্মাহর কিছু করণীয় রয়েছে।
শাবানের আগের মাস হচ্ছে রজব। রাসুল (সা.) রজবের চাঁদ উঠলে দোয়া করতেন ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়াশ শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’। অর্থাৎ হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাসে আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। ‘আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন’ এ কথার অর্থ হচ্ছে, রমজান পর্যন্ত আমাদের জীবিত রাখুন। যেন আমরা রমজান মাস পেয়ে অধিক হারে ইবাদত-বন্দেগি, নামাজ রোজা, তারাবি, লাইলাতুল কদরের ইবাদত, ইতিকাফ ইত্যাদির মাধ্যমে পবিত্র রমজান মাসের ফজিলত লাভে ধন্য হই। এ জন্য পবিত্র রজব মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর রমজানের চাঁদ দেখা পর্যন্ত উপরোল্লিখিত দোয়াটি পাঠ করা মুস্তাহাব। যেহেতু রমজান বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মাস, সেহেতু আগে থেকেই এ মাসের ইবাদত-বন্দেগির জন্য প্রস্তুতি নেওয়াটাই একজন মুমিনের কর্তব্য। হজরত রাসুল (সা.)-এর উপরোক্ত দোয়াই প্রমাণ করে তিনি পবিত্র রজব মাসের শুরু থেকেই রমজানের জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতেন।
রাসুল (সা.) শাবান মাসে রমজানের জন্য মানসিকভাবে তৈরি হতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) শাবানের (দিন-তারিখ হিসাবের) প্রতি এত অধিক লক্ষ রাখতেন যা অন্য কোনো মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না (আবু দাউদ) সুতরাং শাবান মাসের দিন-তারিখের হিসাব রাখাটাও সুন্নত। শাবান মাসে অধিক হারে নফল রোজা রাখা উত্তম। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে শাবান মাসের মতো এত অধিক (নফল) রোজা রাখতে আর দেখিনি। এ মাসের অল্প কিছু দিন ছাড়া সারা মাসই তিনি নফল রোজা রাখতেন (জামি তিরমিজি)
শাবান মাসে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি আমল রয়েছে। শাবান মাসে এ আমলগুলো যথাযথভাবে আদায় করতে পারলেই রমজানের ইবাদত করা সহজ হবে। পরিপূর্ণ ফজিলত ও বরকত লাভ সম্ভব হবে। আমলগুলো তুলে ধরা হলো।
নফল রোজা রাখা : উসামা বিন যায়েদ (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! শাবান মাসে আপনাকে যত রোজা রাখতে দেখি, অন্য মাসে এত অধিক পরিমাণ রোজা রাখতে দেখিনি। অর্থাৎ আপনি কেন এ মাসে এত বেশি রোজা রাখেন? রাসুল (সা.) বললেন, এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি মাসের মধ্যে পড়ে। আর অধিকাংশ মানুষ এ মাসটি সম্পর্কে গাফেল থাকে। অর্থাৎ এ মাসটি সম্পর্কে তারা উদাসীন থাকে। যার ফলে তারা ভালো আমল করে না। তারা ভাবে যে, রমজান তো আছেই। (নাসায়ি)
রমজান জুড়ে ফরজ রোজা পালনে যাতে কারও মধ্যে অলসতা কাজ না করে, রোজা যেন সবার জন্য সহজ হয়ে যায়, সেজন্য রোজার প্রশিক্ষণ হিসেবে শাবান মাসে রোজা পালন করা উত্তম কাজ। আর এতেই মুমিনের ভাগ্যে রমজানের পরিপূর্ণ রহমত, বরকত ও মাগফেরাত মিলবে। হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন, যে আমল করলে মহান আল্লাহ আমাদের অনেক কল্যাণ দান করবেন। রাসুল বললেন, তুমি রোজা রাখো। কেননা অন্য কোনো আমল রোজার মতো হতেই পারে না।
কোরআন তেলাওয়াত করা : সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন ও প্রসিদ্ধ ইমামরা শাবান মাস এলেই বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করতেন। আমাদেরও করণীয় হলো শাবান মাসে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। শাবানের পরবর্তী মাস রমজানকে বলা হয় কোরআন নাজিলের মাস। তাই রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা কর্তব্য। আর এটার প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসেই বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত শুরু করা কাম্য।
দান-সদকা করা : সারা বছরই দান-সদকা করা কাম্য। সালফে সালেহিনরা এ মাস জুড়ে বেশি বেশি দান-সদকা করে রমজানে দান-সাদকার অভ্যাস নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতেন। যাতে রমজান জুড়ে দান-সদকায় অতিবাহিত করা যায়। আমাদেরও করণীয় হলো, রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে এ মাস থেকেই দান-সদকা শুরু করে দেওয়া।
ইসতেগফার করা : ইসতেগফার বলা হয় মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে। রমজানের রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের জন্য শাবান মাস থেকেই সালফে সালেহিনরা বেশি বেশি ইসতেগফার করতেন। যা মানুষকে রমজান জুড়ে আমলে উদ্যোগী করে তোলে। আমাদেরও করণীয় হলো, এ মাসে বেশি বেশি ইসতেগফার করা, যাতে এ চর্চা অব্যাহত রাখা যায় রমজান জুড়ে।
সব মুসলমানের উচিত শাবান মাস জুড়ে নিজেদের ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত রাখা। তাই এই বিশেষ ফজিলতের মাসে প্রত্যেকের জন্য করণীয় হলো উপরোক্ত আমলগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগানো কাম্য। আপনি রমজান পাচ্ছেন কি না তা জানা নেই, তাই আপনি এই মাসকে, আজকের দিনকে আপনার জন্য সুযোগ মনে করে নিন। আগামীকাল আপনি পাবেন কি না সেটার নিশ্চয়তা নেই। তাই আজ থেকেই আমল শুরু করে দিন। রমাজানের প্রস্তুতি নিন। হাদিসের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করে শাবান মাসের এসব ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে জানা যায়। সুতরাং এর বাইরে নিজেদের মনগড়া কোনো কিছু করা সম্পূর্ণ অনুচিত। মহান আল্লাহ আমাদের বুঝার ও আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।
