নবী-রাসুলদের পুণ্যভূমি ‘শাম’

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৩:২১ এএম

পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে শাম অন্যতম। এক সময় সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন এবং অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল মক্কা থেকে এটি উত্তর দিকে অবস্থিত। এর পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে জাজিরাতুল আরবের মরুভূমি ও লোহিত সাগর, পূর্বে ইরাকের সবুজ ছায়াসমৃদ্ধ এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিমে সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী মিসর ও উত্তরে তুরস্কের আনাতোলিয়া মালভূমি অবস্থিত। ইসলাম ও পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনতম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ভূখণ্ড এবং নবুয়ত ও কিতাব নাজিলের স্থান হিসেবে এর গুরুত্ব নিয়ে বিবরণী তুলে ধরা হলো।

শামের সঙ্গে নবী-রাসুলদের সম্পর্ক : পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের সঙ্গে শাম ভূমির সম্পর্ক গভীর। পৃথিবীতে প্রেরিত অনেক নবী-রাসুলের জন্মস্থান, নবুয়ত লাভ এবং আল্লাহর দ্বীন প্রচারের কেন্দ্র হওয়ার সুবাদে শাম বরাবরই মুসলমানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটি বহু সংখ্যক আসমানি কিতাব নাজিলের স্থান হিসেবেও সুপরিচিত। এখানে ইব্রাহিম (আ.) জীবনের বেশিরভাগ সময় অবস্থান করেছেন। তারই পরিবারের সদস্য এবং দুই পুত্র ইসমাইল ও ইসহাক (আ.) ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন। ইসহাক (আ.)-এর পুত্র ইয়াকুব (আ.) এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। ইব্রাহিম (আ.)-এর ভাগিনা ও কোরআনে বর্ণিত মহান আল্লাহর আরেক নবী লুত (আ.) ছিলেন আমুরা ও সাদুম এলাকার নবী।

এখানকার অন্তর্গত সিনাই উপত্যকার তুর পাহাড়ে মুসা (আ.) নবুয়ত ও তাওরাত কিতাব লাভ করেন। হারুন (আ.)-কে তার সহকারী নিযুক্ত করা হয় এবং নবুয়ত দেওয়া হয়। সারা পৃথিবীর প্রথম শাসনকর্তা দাউদ (আ.)-এর শাসনের কেন্দ্রস্থল ছিল শামের ফিলিস্তিন অংশ। তাকে জাবুর কিতাব দেওয়া হয়। তার পুত্র সুলাইমান (আ.)-কে আল্লাহতায়ালা পুরো বিশ্বের রাজত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তি দান করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে (সুলাইমান) বলল, হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা করুন এবং এমন রাজত্ব দান করুন, যা লাভ করা আমার পর আর কারও পক্ষে সম্ভব হবে না। নিশ্চয় আপনি দাতা।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত ৩৫)

এ অঞ্চলে আরও ছিলেন ইলিয়াস (আ.), আল ইয়াসা (আ.) এবং আল খিজির (আ.) প্রমুখ। ইমরান (আ.)-এর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত দুই নবী ও রাসুল ইসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.) এখানেই জন্মগ্রহণ করেন। এখানে তারা নবুয়ত ও কিতাব লাভ করেন এবং এখানে দ্বীন প্রচার করেন। কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইসা (আ.)-কে মহান আল্লাহ এখানকার প্রধান শহর দামেস্ক থেকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন।

পবিত্র কোরআনের সুরা ইয়াসিনে বর্ণিত তিনজন নবীর কেন্দ্র ছিল সিরিয়ার ইনতাকিয়া অঞ্চলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী) আপনি তাদের কাছে সেই জনপদের বাসিন্দাদের উদাহরণ পেশ করুন, যখন তাদের কাছে রাসুলরা এসেছিলেন।’ (সুরা ইয়াসিন ১৩) এখানে আরও অনেক পয়গম্বর প্রেরিত হয়েছিলেন।

রাসুল (সা.) ও শাম : রাসুল (সা.) নবুয়ত-পূর্ব জীবনে বাণিজ্য উপলক্ষে বহুবার শাম অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। তিনি চাচা আবু তালিবের সঙ্গে কৈশোরে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা করতে এসেছিলেন। যৌবনকালে আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী এবং তার প্রথমা স্ত্রী সাইয়্যেদা খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)-এর বাণিজ্যবহর নিয়ে সিরিয়ায় যান। নবুয়তের পর ইসরা ও মিরাজের রাতে এখান থেকেই একমাত্র মানব হিসেবে সাত আসমানের ওপরে মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পবিত্র সত্তা (আল্লাহ), যিনি তার বান্দাকে মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত এক রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন, যে সময়কে আমি বরকতময় করেছি, যেন আমি আমার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল ১) এ ভূমিতেই ইসলামের ইতিহাসের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো হচ্ছে মুতা, তাবুক, ইয়ারমুক, আজনাদিন, ক্রুসেড ও আইনেজালুতের যুদ্ধ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত