ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুজব তৈরির কারখানা ছিল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে রাখেন ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে। আর বোন রেহানার ছেলে ববি ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিককে করেন প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। শেখ পরিবারের বাইরে একমাত্র ট্রাস্টি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। যিনি ছিলেন সিআরআইয়ের মূল অর্থ জোগানকারী। আওয়ামী লীগ আমলে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জ্বালানি খাতে যে পরিমাণ হরিলুট হয়েছে, সেই লুটপাটের অর্থ এ প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎস ছিল। তাছাড়া লুটেরা এমপি, মন্ত্রী ও সরকারের মদদপুষ্ট ব্যবসায়ীরা অর্থের জোগান দিতেন সিআরআইয়ে। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করতেন একঝাঁক প্রযুক্তিজ্ঞানে উচ্চপ্রশিক্ষিত অভিজ্ঞকর্মী, সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদের ছেলেমেয়েরা।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিআরআইয়ের নথিপত্রে উল্লিখিত অফিসের ঠিকানায় অভিযান পরিচালনা করতে যায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু অভিযানে গিয়ে ধানমন্ডির ৬/এ নম্বরের ওই ঠিকানায় সিআরআই অফিসের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির নামে আইএফআইসি ব্যাংকে থাকা ৩৫ কোটি ২১ লাখ টাকার এফডিআরের ডকুমেন্ট (নথিপত্র) উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুদকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিআরআই পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতিসাধনের অভিযোগে গতকাল দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের একটি দল প্রতিষ্ঠানটির অফিসে অভিযান পরিচালনা করতে যায়। কমিশনের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদের নেতৃত্বাধীন টিম অভিযানে গিয়ে কাগজপত্রে প্রতিষ্ঠানটির যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেই ধানমন্ডির ৬/এ নম্বরে অফিসের কোনো অস্তিত্ব পায়নি। তবে দুদক টিম সিআরআইয়ের নামে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে যে হিসাব রয়েছে, তার তথ্য সংগ্রহ করে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, সিআরআই পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সজীব ওয়াজেদ জয়, ভাইস চেয়ারম্যান সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ট্রাস্টি সদস্য রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে আইএফআইসি ব্যাংকে ৩৫ কোটি ২১ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের হিসাবে বিপুল পরিমাণ লেনদেনের তথ্য রয়েছে। অভিযানে পাওয়া ফল ও রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে কমিশনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআইয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে কি না, সেটা যাচাই করতে এখানে এসেছি। ধানম-ির কয়েকটা জায়গা ঘুরেও সিআরআইয়ের অফিস খুঁজে পাইনি। আমরা প্রাথমিকভাবে তথ্যগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযানে আসছি। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে আমরা সেটা জেনেছি। সেই তথ্য যাচাই করতে হলে আমাদের রেকর্ডগুলো সংগ্রহ করতে হবে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান।’
জানা গেছে, অলাভজনক ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল হয়ে কাজ শুরু করে সিআরআই। আওয়ামী সরকার দেশের জনতার চিন্তার জগৎকে যান্ত্রিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে ২০১৩ সালের জুনে সিআরআই নামে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ২ নম্বর ভবনসহ ধানমন্ডি ৬/এ-তে আরও দুটি কার্যালয়ে অপপ্রচারের এই দপ্তর খোলে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার ফেসবুক পেজ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, মেসেঞ্জার গ্রুপ ও ব্লগে অপপ্রচার চালাত। লেটস টক এবং জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডের মতো কিছু অনুষ্ঠানও করে এ প্রতিষ্ঠান। ট্রাস্টের অনুকূলে বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন টকশোতে যারা আওয়ামী লীগের মতের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং যৌক্তিক বয়ান তৈরি করতে পারত, তাদের ভয়ে রাখতে বিভিন্ন উপায়ে নাজেহাল করত সিআরআই। বিশেষ করে বিএনপির নারী অ্যাকটিভিস্টদের লক্ষ্য বানাত। বিএনপির মিডিয়া সেলের বিরুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠান ছিল আগ্রাসী। প্রতিটি আন্দোলনের সময় নেতাকর্মীদের অবস্থান ট্র্যাকিং এবং ফোনকলের কথা ছড়ানোতে দক্ষ ছিল এ প্রতিষ্ঠান। ফোন কলে আড়িপাতার জন্য ইসরায়েল থেকে প্যাগাসাস যন্ত্র কেনার পরামর্শদাতাও ছিল এ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি জন্মলগ্ন থেকেই জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। শেখ হাসিনার মুখের বয়ান তৈরি করে দিত এ প্রতিষ্ঠান। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি তার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করতে প্রতিনিয়ত মিডিয়ার সামনে যেসব প্রোপাগান্ডা নিয়ে হাজির হতেন, তার সিংহভাগ তৈরি করে দিত এই সিআরআই।
