ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাসহ দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। গতকাল শুক্রবারের এ বৈঠকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে দলের পক্ষ থেকে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য।
এদিকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। গত বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন। অন্যথায় দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির প্রসার ঘটবে। সুতরাং কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা দৃশ্যমান করা এখন সময়ের দাবি।’
গতকালের বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুরসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের আগেই গত বৃহস্পতিবার রাতে দলীয় অবস্থান জানানো হয়েছে।’
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষ হয় দুপুর ১টায়। এতে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘরবাড়ি, স্থাপনা ও নামফলক ভেঙে ফেলার ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের করণীয় নির্ধারণে লন্ডন সময় ভোর সাড়ে ৫টায় দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন তারেক রহমান। সাধারণত প্রতি সোমবার লন্ডন সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়) স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
গতকালের বৈঠকে অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস (অনলাইনে), গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (অনলাইনে), আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (অনলাইনে), সালাহউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (অনলাইনে), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও অধ্যাপক ডাক্তার এ জেড এম জাহিদ হোসেন (অনলাইনে)।
গতকালের বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ জুড়ে চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আমরা সমর্থন করছি না। গণঅভ্যুত্থানের ছয় মাস পরে এসে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তার দায় অন্তর্র্বর্তী সরকারের ওপর বর্তায়। কারণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ সরকারকে কঠোর হাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির আরও প্রসার ঘটবে। এ ইস্যুতে আগামী সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের উদ্বেগ ও অবস্থান তুলে ধরবে বিএনপি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশ জুড়ে ভাঙচুরের ঘটনাগুলো আগামী জাতীয় নির্বাচনকে প্রলম্বিত করার ষড়যন্ত্র বলে মনে করে বিএনপি। একই সঙ্গে এটাকে এক ধরনের ফাঁদ হিসেবেও দেখছে দলটি। তাই নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা-হিংসাত্মক কর্মকা-ে জড়িত না হওয়ার জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। ইতিমধ্যে কেন্দ্র থেকে এমন নির্দেশনা তৃণমূলে পাঠানো হয়েছে।
নেতারা জানিয়েছেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দ্রুত নির্বাচন দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে আছে বিভাগ ও জেলায় জেলায় সমাবেশ। রমজানের আগেই এই কর্মসূচি পালিত হবে। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। বিএনপি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন চায়। তবে এ বছরের জুলাই-আগস্টেও নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব বলে মনে করে দলটি। মূলত নির্বাচন দাবিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই কর্মসূচি দিতে যাচ্ছে বিএনপি। চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অন্তর্র্বর্তী সরকারের যে লক্ষ সেটি পূরণ হবে না। ন্যূনতম সংস্কার করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাই এই সরকারের লক্ষ্য; গত এক দশক ধরে যে ধরনের নির্বাচন বাংলাদেশ হয়নি। কারণ শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে দেশে ২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালে ডামি নির্বাচন হয়েছে; যেখানে মানুষ ভোট দিতে পারেনি কিংবা দেয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকারবঞ্চিত জনগণ এখন ভোট দিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির গভীর উদ্বেগ : দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো বিএনপির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার এবং তার দোসরদের উসকানিমূলক আচরণ, জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে অশালীন এবং আপত্তিকর বক্তব্য ও মন্তব্য দেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং ক্রোধের জন্ম দিয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে গত বুধবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত স্বৈরাচারের স্মৃতি, মূর্তি, স্থাপনা ও নামফলকগুলো ভেঙে ফেলার মতো জনস্পৃহা দৃশ্যমান হয়েছে।’
বিএনপি উল্লেখ করেছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত ছয় মাসেও পলাতক স্বৈরাচার এবং তাদের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ জনসম্মুখে দৃশ্যমান করতে সফল হয়নি বলে জনমনে প্রতিভাত হয়েছে, ফলে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হচ্ছে। একটি সরকার বহাল থাকা অবস্থায় জনগণ এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিলে দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে। অথচ জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী জনগণের প্রত্যাশা ছিল, দেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, যা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা ধরনের দাবি-দাওয়া নিয়ে যখন-তখন সড়কে ‘মব কালচারের’ মাধ্যমে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করছে, যা সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে মুনশিয়ানা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই-আগস্টের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারদের রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, নিন্দিত ঘৃণিত পলাতক স্বৈরাচার এবং তার দোসরদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরাজিত ফ্যাসিস্টদের উসকানিমূলক তৎপরতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অতি জরুরি অগ্রাধিকার, অথচ এসব বিষয়ে দৃশ্যমান এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এখনো প্রশাসনকে পতিত ফ্যাসিস্ট শাসকের দোসরমুক্ত করা হয়নি, বিচার বিভাগে কর্মরত ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনো বিদ্যমান, পুলিশ প্রশাসনে গণঅভ্যুত্থানবিরোধী সক্রিয় সদস্যরা এখনো কর্মরত। এমতাবস্থায় সরকার জনআকাক্সক্ষা পূরণে সফলতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক করে।
বিএনপির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের নিত্যদিনের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা জরুরি, দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা গায়েবি মামলার কোনো সুরাহা এখনো হয়নি। গণতন্ত্রকামী জনগণ ফ্যাসিবাদী আমলের করা মিথ্যা মামলায় এখনো হয়রানির শিকার হচ্ছে, অথচ এ বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি।
বিএনপি উল্লেখ করে, জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে মানুষের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, মানবাধিকারসহ ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথা শিগগির সম্ভব একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নির্বাচনমুখী জরুরি সংস্কার সাধন করে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করাই বর্তমান সরকারের প্রধানতম ম্যান্ডেট। অথচ জনআকাক্সক্ষা উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেরাই এই অগ্রাধিকারকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যান্য বিষয়ে অধিক মনোযোগী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরাচারের স্মৃতিচিহ্ন নিশ্চিহ্ন কিংবা নির্মূলের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন নিহিত নয়, বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শিক চিন্তা, শক্তি ও প্রভাবের আদর্শিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-ঐক্যকে দৃঢ় ভিত্তি দেওয়া এবং জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাই উত্তমপন্থা। জনগণের মধ্যে এই ধরনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে আমাদের সবারই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’
সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা প্রকাশ করতে না পারলে রাষ্ট্র ও সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপি বলেছে, এই পরিস্থিতিতে উগ্র নৈরাজ্যবাদী গণতন্ত্রবিরোধী দেশি-বিদেশি অপশক্তির পাশাপাশি পরাজিত ফ্যাসিস্টদের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, যার উপসর্গ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।
