অবকাঠামোর অপ্রতুলতাসহ নানা সমস্যায় পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা। অসহনীয় যানজট, জলাবদ্ধতা, এসএমই খাতে অপর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ডলারের মূল্যের অস্থিরতা, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, উচ্চ সুদহার, ভ্যাট ও করের হার বৃদ্ধি এবং জটিল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানীর ব্যবসার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। বিদ্যমান সমস্যাগুলোর আশু সমাধানে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে বলে আলোচকরা মতপ্রকাশ করেন।
পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত মতবিনিময় সভা গতকাল শনিবার লালবাগের মীম কমিউনিটি সেন্টারে হয়। যেখানে পুরান ঢাকার বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এবং বেশ কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে এই মতামত ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার জটিলতা, ব্যবসার আকার, প্রকৃতি ও সক্ষমতা অনুযায়ী করা ব্যবস্থার সহজীকরণ, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা নিরসন, বাস্তবভিত্তিক ভ্যাটহার নির্ধারণের ওপর জোরারোপ করেন। তিনি বলেন, শত বছর ধরে পুরান ঢাকা ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রস্থল হলেও যানজট, অবকাঠামোর অপ্রতুলতা এবং কর ও ভ্যাটের প্রতিবন্ধকতার কারণে এখানকার উদ্যোক্তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা নিরসনে সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একান্ত অপরিহার্য।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, বর্তমানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এলসি মার্জিন ন্যূনতম ৫০ শতাংশ থেকে হ্রাস করা প্রয়োজন। এ ছাড়া অর্থবছরের মধ্যে এসআরও জারি করে শুল্কহার পরিবর্তন করলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিফ ইকোনমিস্টস ইউনিটের পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. সেলিম আল মামুন বলেন, ২০২২-২৪ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারে ডলারের মূল্য ৩৫% অবমূল্যায়িত হওয়ার কারণে ডলারের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় এবং মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতে স্থিতিশীলতা আনায়নে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি জানান, ছয় মাসে আমদানি ও রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ৩.৫% এবং ১০.৯% এবং সাত মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি আরও বলেন, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ডিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মনোয়ার হোসেন করের হার কমিয়ে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করেন। সেই সঙ্গে করের হার যৌক্তিকীকরণের ওপর জোরারোপ করেন।
ডিসিসিআইয়ের প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি আলহাজ আব্দুস সালাম বলেন, ‘অসহনীয় যানজটের কারণে ব্যবসায়ীদের বিক্রি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এমতাবস্থায় কর ও ভ্যাটের উচ্চহার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে আমরা ক্রমেই ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছি।’
ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (লালবাগ বিভাগ) মো. জসীম উদ্দিন বলেন, পুরান ঢাকার যানজট নিরসনে আটটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে এদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এ ছাড়া আসন্ন রমজান মাস নগদ টাকা পরিবহনে ব্যবসায়ীদের পুলিশের সহায়তা নেওয়ার প্রস্তাব করেন। যানজট নিরসনে পুরান ঢাকার বেশ কিছু রাস্তা ওয়ানওয়ে করা হবে এল তিনি অভিহিত করেন। কিশোরগ্যাংকে একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এটি মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্যাকেজ ভ্যাটব্যবস্থা চালু করা, ট্যাক্স-ভ্যাট ব্যবস্থার সহজীকরণ, যানজট নিরসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিশেষ করে কিশোরগ্যাংয়ের উৎপাত নিয়ন্ত্রণ, আমদানি পর্যায়ে ট্যারিফ ভ্যালুর ওপর শুল্ক আরোপ, ভ্যাটহার হ্রাস, বন্ড লাইসেন্সের আওতায় আমদানি করা পণ্যের অপব্যবহার বন্ধ করা, সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং বন্দরের পণ্য খালাস প্রক্রিয়া অটোমেটেড ও সহজীকরণ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জোরারোপ করেন।
অনুষ্ঠান শেষে ৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ডিসিসিআইয়ের সদস্যপদ দেওয়া হয় এবং ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির হাতে ডিসিসিআইয়ের মেম্বারশিপ সার্টিফিকেট হস্তান্তর করেন।
