বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নাম বদলের প্রস্তাব করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। এ-সংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত কমিটির সুপারিশ গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগে পাঠিয়েছেন উপাচার্য। গতকাল শনিবার পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ মনে করছে, আজ-কালের মধ্যেই নাম বদলের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি বর্তমান নাম বদলে নতুন নাম ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রস্তাব করেছে। এর আগে গতকাল দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বিএসএমএমইউয়ে কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন জায়গায় ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে ব্যানার টানিয়েছেন। তারও আগে গত বুধবার রাতে ও পরদিন বৃহস্পতিবার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ নাম-সংবলিত সমস্ত সাইনবোর্ড খুলে ফেলা হয়। গত বুধবার রাত ১২টার দিকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সি-ব্লক ভবনে টানানো সাইনবোর্ড খুলে ফেলা ও শেখ মুজিবের সব ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হয়। যেখানে সাইনবোর্ড সরানো সম্ভব হয়নি, সেখানে কালি দিয়ে লেপে দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলের জন্য গঠিত কমিটির সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডা. শেখ ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের চাপ আসছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি বর্তমান নাম বদলের সুপারিশ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনো সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু তার আগেই ছাত্র-জনতা এসে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নামের ব্যানার টানিয়ে দিয়ে গেছে।’
বিশ^বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদল করার জন্য প্রচ- চাপ রয়েছে। সরকারি নির্বাহী আদেশের অপেক্ষায় আছি। আমরা আমাদের প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। নাম পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ যে কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির সিদ্ধান্ত সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। আশা করছি, আজ-কালের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেড় মাস আগে নাম পরিবর্তনের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছিল। গত বুধবার ছাত্র-জনতা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিব ও ধানম-িতে শেখ হাসিনার বাসভবন ‘সুধা সদন’সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসভবন ভাঙচুর চালায় ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় নাম বদলের নতুন চাপের মুখে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। ফলে গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য কমিটির সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠিয়েছেন। আমরা এখন সরকারের থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার অপেক্ষায় আছি।’
এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে সমাবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-চিকিৎসকসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ‘বিএসএমএমইউ বৈষম্যবিরোধী শিক্ষক-চিকিৎসক, কর্মকর্তা-নার্স ও কর্মচারী ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে ওই সমাবেশ হয়েছিল। সেদিন ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার-১ ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন টিটো বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিবুরের নামে থাকতে পারে না। অবিলম্বে এটি পরিবর্তন করতে হবে।’
বিএসএমএমইউ দেশের প্রথম সরকারি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল রিসার্চ (আইপিজিএমআর) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এটি পরিচিত ছিল পিজি হাসপাতাল নামে। পরে ১৯৯৮ সালে সরকার দেশে উচ্চচিকিৎসা-শিক্ষা, সেবা-শিক্ষা ও গবেষণার সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য এটিকে একটি স্বতন্ত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ডা. এমএ কাদেরী এবং বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহিনুল আলম।
নাম বদলে গেছে যেসব প্রতিষ্ঠানের : অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তাদের পরিবারের সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে থাকা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে গত বছরের ৩ নভেম্বর ১৪ সরকারি হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করা হয়। সেগুলো হলো ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর’-এর পরিবর্তে ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’, ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, গোপালগঞ্জ’-এর পরিবর্তে ‘গোপালগঞ্জ চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’, ‘শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টাঙ্গাইল’-এর পরিবর্তে ‘টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’, ‘ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’-এর পরিবর্তে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি’, ‘শেখ রাসেল ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’-এর পরিবর্তে ‘ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’, গোপালগঞ্জের ‘শেখ লুৎফর রহমান ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল’-এর পরিবর্তে ‘গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল’, ‘শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’-এর পরিবর্তে ‘গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’, ‘শেখ সায়েরা খাতুন ট্রমা সেন্টার’-এর পরিবর্তে ‘গোপালগঞ্জ ট্রমা সেন্টার’, ‘সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতাল’-এর পরিবর্তে ‘সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল’, ‘শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জামালপুর’-এর পরিবর্তে ‘জামালপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,’ ‘শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, খুলনা’-এর পরিবর্তে ‘খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল’, ‘বঙ্গবন্ধু (দলদিয়া) ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ’-এর পরিবর্তে ‘দলদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ’, ‘কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ’-এর পরিবর্তে ‘মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ এবং ‘এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর’-এর পরিবর্তে ‘দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’।
এরপর গত বছরেরে ১৮ নভেম্বর আরও ৩ মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন করা হয়। এর মধ্যে গোপালগঞ্জের ‘শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজের’ নাম ‘গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ’, সুনামগঞ্জের ‘বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের নাম সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ’ এবং ‘হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের নাম করা হয় ‘হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ’।
