নতুনত্ব নেই তবু বাস্তবায়িত হলে সাধুবাদ

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, যুগোপযোগী এবং আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারে জোর দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ৩০টির বেশি সুপারিশযুক্ত ৩৯০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়েছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আইন ও বিচারসংশ্লিষ্টদের অভিমত নিয়েছে দেশ রূপান্তর। তাদের মতে, প্রস্তাবনাবলিতে খুব বেশি নতুনত্ব নেই। প্রস্তাবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইতিমধ্যে সমাধান হয়ে গেছে বা সমাধান হওয়ার পথে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়েছে। বিশ্লেকদের মতে, কমিশনের প্রস্তাবগুলো এখনো প্রাথমিক ধাপে ৎআছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে। এগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বিচার বিভাগ অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের অধ্যাদেশ জারি হয়ে গেছে। নিজস্ব সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পথে।’ সার্বিকভাবে কমিশনের প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবনাবলিতে নতুনত্ব না থাকলেও এগুলো বাস্তবায়িত হলে সাধুবাদ জানাব।’

তিনি বলেন, ‘বিভাগীয় পর্যায়ে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়টি অষ্টম সংশোধনীর মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এখন এটি করতে গেলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হবে। এটি এখন প্রায়োরিটির মধ্যেও পড়ে না। এ বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলেও সে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।’

উচ্চ আদালতে বিচারকদের অবসরের বয়স ৭০ বছর করার প্রস্তাবকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সাবেক বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, ‘অবসরের এ বয়সটি স্ট্যান্ডার্ড। এটি হওয়া উচিত।’ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি থাকতেই হবে। না হলে সবকিছুর জন্য মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। তারা যেটা ইচ্ছা হয়, সে ফাইলটি তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করে আর যেটা তাদের বিরুদ্ধে যায় সেটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। এজন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় খুব প্রয়োজনীয়।’

সাজাপ্রাপ্তদের ক্ষমা করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কমিয়ে আনার বিষয়ে আপিল বিভাগের সাবেক এ বিচারপতি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি এটি করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। কিন্তু দেখা যায়, যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের ইচ্ছামতো এটি করা হয়ে থাকে। এটার জন্য নিশ্চয়ই একটি রক্ষাকবচ থাকতে হবে।’ ছয় মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের রায় প্রকাশের প্রস্তাব বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় মানে জনগণের রায়। অবসরে যাওয়ার পর বিচারকের শপথ আর থাকে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা দেওয়া দরকার।’ জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রস্তাবের বিষয়ে বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, ‘এটি (জ্যেষ্ঠতা) থাকা উচিত। অনেক দেশে এ বিষয়ে আইন হয়েছে। জ্যেষ্ঠতার নিয়ম না থাকাই অন্যায় ও অস্বাভাবিক।’ প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এগুলো মতামত ও সুপারিশ। এ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা হবে। এরপর নির্বাচিত জাতীয় সংসদ এগুলোকে গ্রহণ করার সময় পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হবে। এখনই এগুলোকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার জন্য কী কী করা দরকার এবং যেগুলোর বিষয়ে আমরা অনেক দিন ধরে বলে আসছি, সেগুলো ওনারা (বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন) বলেছেন। এর মধ্যে কিছু বিতর্কও সৃষ্টি করেছেন। যেমন, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়টি অষ্টম সংশোধনীর মামলায় হাইকোর্ট একটিই থাকবে বলে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও আদালত স্থাপনের বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এ ধরনের সুপারিশ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গেছে বলে মনে হয়।’ তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের বিষয়ে আইন হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রধান বিচারপতি উদ্যোগ নিয়েছেন। এটিও হয়ে যাওয়ার পথে। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের জন্য খসড়া তৈরি আছে। চাইলেই এটি করতে পারে।’

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে হবেন, এটি কমিশনের প্রস্তাবে নেই। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া লাখ লাখ মামলার বিষয়ে বিচার বিভাগের সংস্কার করে অতিরিক্ত লোক নিয়োগ ও অবকাঠামোর বিষয়ে তেমন কিছু নেই বলে মনে হয়েছে। উচ্চ আদালতে বিচারকের সংকট রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়েও কিছু বলা নেই।’

তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের রায় দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে রায়ে স্বাক্ষর করা ও রায় প্রকাশ করার বিষয়টি সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা কার্যকরী করেছিলেন। অন্য যেসব বিষয় আছে যেমন, বিচারাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায় রয়েছে। কেউ যদি রায় মানতে না চায় তাহলে তো কারোর করার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসামিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার ব্যাপারে নীতিমালার অভিমত সংবলিত হাইকোর্টের একটি রায় আছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এবং বিচারপতিরা যেহেতু রাষ্ট্রপতির অধীনে নিয়োগ পান, তাই উচ্চ আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে সাহস পায় না।’

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে খুব বেশি আশাবাদী নন উল্লেখ করে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘এগুলো বাস্তবায়ন করতে চাইলে অনেক আগেই করে ফেলা যেত। কিন্তু কেউ তো করেনি। এ সরকারের আমলেও বাস্তবায়িত হবে কি না সন্দেহ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত