গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ খ ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে ভাঙচুরের সময় ‘স্থানীয়দের হামলায়’ আহত কাশেম খান (১৭) নামে এক কিশোর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার মৃত্যু হয়। আবুল কাশেমের মৃত্যুকে ‘প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রমের দক্ষিণখানে মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলা চালায় একদল বিক্ষুব্ধ জনতা। তবে স্থানীয়দের পাল্টা হামলায় ভাঙচুর করতে যাওয়াদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন আহত হন। সেই রাতেই আহতদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ৫ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল সেখানেই মৃত্যু হয় কাশেমের। পরে বৈষম্যবিরোধীদের পক্ষ থেকে এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়।
গতকাল কাশেমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমসি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক।
এদিকে কাশেমের মৃত্যুর ঘটনায় নগরীর বোর্ডবাজার সংলগ্ন দক্ষিণ খাইলকুর এলাকায় বইছে শোকের মাতম। পিতৃমাতৃহীন এতিম স্কুলছাত্র আবুল কাশেমের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তার স্বজনরা। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছেন তারা। আবুল কাশেম নিহতের ঘটনায় গত রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুর শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মশাল মিছিল করেছে ছাত্র-জনতা।
গতকাল সন্ধ্যায় দক্ষিণ খাইলকুর এলাকায় গিয়ে কথা হয় আবুল কাশেমের ফুফু নাসিমা আক্তারের সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, আবুল কাশেমের বয়স যখন প্রায় দেড় বছর তখন তার মা রেখা বেগম তাকে রেখে অন্যত্র চলে যান। তার বাবা হাজি জামাল উদ্দিন চিশতি ফের বিয়ে করেন। আর আবুল কাশেম বড় হয় তার দাদি আলেক জানের কাছে। দাদি মারা যাওয়ার পর কাশেম একা হয়ে যায়। এর মধ্যে মারা যায় তার বাবাও। কাশেমের একমাত্র বড়ভাই হাতেম আলী গত আগস্ট মাসে আত্মহত্যা করেন। একমাত্র স্কুলপড়ুয়া বোন সুইটি থাকেন চাচার কাছে। আর আবুল কাশেম একাই থাকত বাবার রেখে যাওয়া দেড় কাঠার একটি বাড়িতে। সেখানে তিনটি কক্ষ ভাড়া দিয়ে একটিতে সে নিজে থাকত। নিজেই রান্না করে খেত। সে স্থানীয় অনুশীলন প্রি-ক্যাডেট একাডেমি স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। পড়ালেখায় অনিয়মিত থাকলেও শ্রমিকের কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে উপার্জন করত। এতেই তার সংসার চলত।
কফিন মিছিল থেকে আ.লীগ নিষিদ্ধের দাবি : নিহত আবুল কাশেমের কফিন নিয়ে গতকাল রাতে রাজধানীতে মিছিল হয়েছে। মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যায়। ওই মিছিল থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ নেতারা। মিছিলটি শাহবাগ মোড়ের আগে গিয়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। রাত ৯টার কিছু আগে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে আবুল কাশেমের মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হয়। সেখানে তার প্রথম জানাজা হয়। জানাজা শুরুর আগে কাতারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সদস্য সচিব আরিফ সোহেল।
গাজীপুরে আজ জানাজা শেষে দাফন : আবুল কাশেমের জানাজা আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় গাজীপুর রাজবাড়ি ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে। পরে বেলা সাড়ে ১১টায় বোর্ডবাজার সংলগ্ন আল হেরা সিএনপিজ পাম্পের মাঠে আরেকটি জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
এদিকে গাজীপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় আরও ১৩২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ : আবুল কাশেমের মৃত্যুকে ‘প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। একইসঙ্গে এই ঘটনায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার বিকেলে আবুল কাশেমের মৃত্যুর ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের নিজস্ব আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ দাবি জানান। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘গাজীপুরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত কাশেম শহীদ হয়ে গেছেন। প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ আমার এই ভাই। ইন্টেরিম, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করো, করতে হবে।’
