বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মধ্যকার এবারের সীমান্ত সম্মেলনে নয়াদিল্লিতে ভারতের সঙ্গে বুক চিতিয়ে কথা বলবে বাংলাদেশ। সীমান্ত হত্যা, বাংলাদেশের ভেতরে বিএসএফের অনধিকার প্রবেশ ও তাদের বেআইনি কার্যক্রম নিয়ে কড়া ভাষায় কথা বলবে বিজিবি। আগামীকাল সোমবার থেকে শুরু হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে চলবে এ সম্মেলন। ৫৫তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের এ সীমান্ত সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের কড়া অবস্থান সম্পর্কে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট নানা সূত্রে।
এরই মধ্যে সম্মেলনে আলোচনার সম্ভাব্য বিষয়গুলো সম্পর্কে গত ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত দেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সেদিন সচিবালয়ে প্রস্তুতিমূলক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে মূল আলোচ্য বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের কথার “টোন” আলাদা হবে। ভারতীয় নাগরিক, বিএসএফ ও অন্য যারা সীমান্তে হত্যা করছে, এটি যেভাবে হোক, তাদের (ভারত) বন্ধ করতে হবে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক সময় দেখা গেছে, বিএসএফ এবং তাদের দুষ্কৃতকারীরা সীমান্ত থেকে কৃষিকাজ করার সময় বাংলাদেশের নাগরিক ধরে নিয়ে যায়। এটি যেন তারা না করে, সেজন্য তাদের বলা হবে।’ অনেক সময় সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে পারাপারের চেষ্টা করা হয় বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়গুলো যেন না হয়, সে বিষয়ে আলোচনা হবে। ভারতীয়রা অনেক সময় সীমান্ত এলাকায় ফেনসিডিলসহ মাদকের কারখানা তৈরি করে। যদিও বলে, ফেনসিডিল ওষুধ হিসেবে বানায়। কিন্তু বানায় মাদকের জন্য। এটি বাংলাদেশের ভেতরে যায়। এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। সীমান্তে ১৫০ গজের ভেতরে কতগুলো কাজ, যেগুলো করার নিয়ম নেই, এগুলো অনেক সময় তারা করতে চায়। আর কিছু কাজ আছে, যেগুলো করতে হলে দুই দেশের অনুমোদন লাগে। এই অনুমতি নিয়ে যেন তারা করে, এটা নিয়েও আলোচনা হবে।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘ভারতীয় গণমাধ্যম যে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে, এটি কীভাবে তারা বন্ধ করতে পারে, সে ব্যাপারেও আলোচনা হবে। এ ছাড়া নদীর পানির যেন সুষম বণ্টন হয়, পানি চুক্তির বাস্তবায়ন ও কীভাবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ভালো হয়, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পায় এগুলোর ব্যাপারে আলোচনা হবে।’
ভারতের সঙ্গে চারটি চুক্তি হওয়ার কথা উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘২০১০ সালে যে চুক্তিটি হয়েছে, সেটির ভেতরে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। চুক্তিটি কিছুটা অসম। এজন্য আলোচনা হবে, এ চুক্তি এভাবে হয়নি, এভাবে হওয়া দরকার ছিল। এগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আগেও জানানো হয়েছে।’
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, এবারের সীমান্ত সম্মেলনে অংশ নিতে বিজিবি মহাপরিচালকসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বিজিবির সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের ১৪ জনের একটি দল আগামীকাল ভারতের নয়াদিল্লিতে পৌঁছাবে। দলটির সদস্যরা সেখানে চার দিন বিভিন্ন বৈঠকে মিলিতে হবেন বিএসএফসহ ভারতের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে।
এবারের সীমান্ত সম্মেলনে বিএসএফ জোর দেবে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ রোধসহ দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপারে। এসব বিষয় তুলে ধরে গতকাল শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্মেলনে বিজিবির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। আর বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্বে থাকবেন বাহিনীটির মহাপরিচালক দলজিৎ সিং চৌধুরী। বিএসএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সীমান্ত সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাই এবারের আলোচনার মূল লক্ষ্য।
গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই হবে দুপক্ষের মধ্যে প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক। সর্বশেষ দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর দ্বি-বার্ষিক আলোচনা গত বছরের মার্চে ঢাকায় হয়েছিল।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম ও মিজোরাম এই পাঁচটি রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত। গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। পরে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করে জানায়, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান রোধ ও বেড়া নির্মাণসহ নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ঢুকে কৃষকদের মারধরের ঘটনায় বিএসএফের দুঃখ প্রকাশ : বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পাঁচ কৃষককে মারধরের ঘটনায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় ওই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে বিএসএফ।
গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলার গোরকমন্ডল সীমান্তের ৯২৯ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের ৪ নম্বর সাব-পিলারের পাশে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পতাকা বৈঠকে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি কৃষকদের মারধরের কড়া প্রতিবাদ জানায় বিজিবি।
বিজিবি সূত্র জানায়, বৈঠকে বিজিবির পক্ষে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাকিল আলম এবং বিএসএফের পক্ষে ভারতীয় ৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসার অমিত কুমার নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তের শূন্যরেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে মাঠে কাজ করা সাধারণ কৃষকদের এলোপাতাড়ি মারপিট করে আহত করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। জবাবে ভারতীয় বিএসএফ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। এ ঘটনায় জড়িত বিএসএফ সদস্যেদের শাস্তি প্রদানসহ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। বৈঠক শেষে বিজিবি ও বিএসএফের প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে উপজেলার কৃষ্ণানন্দ বকসী সীমান্তের ৯৩০ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের ৮ নম্বর সাব-পিলারের পাশে বাংলাদেশের কৃষিজমিতে কাজ করছিলেন কয়েকজন কৃষক। এ সময় ভারতীয় নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের ১০/১২ জন বিএসএফ সদস্য হরিদাস খামার এলাকার কাঁটাতারের বেড়ার ৩ নম্বর গেট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে মাঠে কাজ করা কৃষকদের গালাগালি করতে থাকে। কৃষকরা প্রতিবাদ করলে বিএসএফ সদস্যরা লাঠি দিয়ে কৃষকদের এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করে। কৃষকরা ভয়ে গ্রামের দিকে দৌড়াতে থাকলে বিএসএফ তাদের পিছু নিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়ে। পরে গ্রামবাসী জড়ো হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে বিএসএফকে ধাওয়া করলে তারা কাঁটাতারের ভেতরে পালিয়ে যায়। এ সময় বিএসএফের মারপিটে পাঁচ কৃষক আহত হন। আহতরা হলেন কৃষ্ণানন্দ বকসী গ্রামের মৃত ইসরাইলের ছেলে শামসুল হক (৫৫), মৃত খোকা মামুদের ছেলে জাবেদ আলী (৬০), মুন্নাফ হোসেনের ছেলে কাসেম আলী (৪৮), মৃত মুকুল ইসলামের ছেলে রিপন মিয়া (৩৫) ও কাশেম আলীর ছেলে তাজুল ইসলাম (৩৮)।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাকিল আলম জানান, পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশে ঢুকে বাংলাদেশি কৃষকদের মারপিটের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। জবাবে বিএসএফ দুঃখ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটানোর এবং জড়িত বিএসএফ সদস্যদের শাস্তি প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।
