ট্রাম্প-মোদির বৈঠক, আলোচনায় বাংলাদেশ

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:২০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াশিংটনে দুই বিশ্ব নেতার বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের পর এ কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। ওইদিন হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প-মোদি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়াবলি নিয়েও আলোচনা হয়।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশ পরিস্থিতি।’ বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী (নরেন্দ্র মোদি) বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিষয়াবলি নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেছেন। ভারত এ পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে, তা-ও উল্লেখ করেছেন তিনি।’

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমরা আশা করি যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন দিকে এগোবে, যেখানে আমরা তাদের সঙ্গে একটি গঠনমূলক ও স্থিতিশীল উপায়ে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারব।’

এর আগে ট্রাম্প-মোদির বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডিপ স্টেটের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অভিমত জানতে চান এক ভারতীয় সাংবাদিক। প্রথমে ওই সাংবাদিক মোদির কাছে হিন্দিতে জানতে চান, ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ভারতের ভূমিকার বিষয়ে। এরপর ট্রাম্পের উদ্দেশে ইংরেজিতে প্রশ্ন করেন তিনি। ট্রাম্পকে ওই সাংবাদিক বলেন, ‘আপনি বাংলাদেশ বিষয়ে কী বলতে চান? কেননা আমরা দেখেছি এবং এটা স্পষ্ট যে, বাইডেন প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট ক্ষমতার পরিবর্তনে জড়িত ছিল; এরপর জুনিয়র সরোসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুহাম্মদ ইউনূস। সুতরাং বাংলাদেশের বিষয়ে আপনার অভিমত কী?’

উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে (বাংলাদেশে) কথিত ডিপ স্টেটের কোনো ভূমিকা ছিল না। এটা এমন একটা বিষয়- যেখানে প্রধানমন্ত্রী (নরেন্দ্র মোদি) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।’ এরপর নরেন্দ্র মোদির দিকে ইঙ্গিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘স্পষ্ট করে বললে, ভারত সেখানে শত শত বছর ধরে কাজ করেছে, আর সেসব বিষয় তিনি পড়েছেন।’ পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইশারা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘বাংলাদেশের বিষয় আমি প্রধানমন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দেব।’

এরপর নরেন্দ্র মোদি উত্তর দিতে গিয়ে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরলেও বাংলাদেশ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

পরে ব্রিফিংয়ে আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ট্রাম্পের বক্তব্যকে দিল্লি কীভাবে ব্যাখ্যা করছে এবং বাংলাদেশের বিষয়ে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব মিশ্রি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের উদ্বেগের কথা ট্রাম্পের কাছে কথা তুলে ধরার কথা জানান ভারতীয় এ কর্মকর্তা।

মিশ্রি বলেন, ‘আমরা আশা করি, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন দিকে এগিয়ে যাবে- যেখানে আমরা তাদের সঙ্গে গঠনমূলক ও স্থিতিশীল পথে সম্পর্ক চালিয়ে নিতে পারব। এ ক্ষেত্রে কিছু উদ্বেগ রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সেসব বিষয়ে অভিমত তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।’

এদিকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মোদির ওয়াশিংটন সফর অবধারিতভাবেই ছিল ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থকে চাঙ্গা করা। মোটাদাগে বলতে গেলে, মোদির এবারের ওয়াশিংটন সফর ছিল মূলত ব্যবসাকেন্দ্রিক। তাই স্বাভাবিকভাবেই এটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরের আড়ম্বর থেকে মুক্ত ছিল।

বিবিসি বলছে, মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ২০২৫ সাল থেকে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ আরও সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি বাড়াবে। এ ছাড়া, দুই দেশ একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে এবং নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো চূড়ান্ত করতে সম্মত হয়েছে।

ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, এখনো মাত্র এক মাসেরও কম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

ট্রাম্প-মোদি বৈঠকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে বিবিসি। মোদির সফরের সময় ট্রাম্প নির্দেশ দেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের ‘পাল্টা শুল্ক’ গুনতে হবে। অর্থাৎ, আমেরিকান পণ্যের ওপর যে শুল্ক ধার্য করা হয়, সেই অনুপাতে যুক্তরাষ্ট্রও সেই দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করবে। তিনি তার উপদেষ্টাদের নতুন শুল্ক কাঠামো প্রস্তুত করতে বলেছেন, যা ১ এপ্রিলের মধ্যে কার্যকর হতে পারে।

বর্তমানে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব এড়াতে ভারত সাম্প্রতিক বাজেটে গড় শুল্ক হার ১৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করেছে। তবে এই পদক্ষেপে ভারত আসলেই শুল্ক চাপ এড়াতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, এ মুহূর্তে ভারতের জন্য বড় কোনো শুল্ক সংকট দেখা দেবে না।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি শুধু আমদানি শুল্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার এবং বিভিন্ন বাণিজ্য বিধিনিষেধ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ভারতের আমদানি পণ্যের ওপর আরোপিত পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ট্রাম্প এটিকে তার শুল্কনীতির স্বপক্ষে ব্যবহার করতে পারেন।

তারা বলছেন, কেবল শুল্ক আরোপ করে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব নয়। প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি খাতে বড় আকারের কেনাকাটার মাধ্যমে এই ঘাটতি কিছুটা কমানো যেতে পারে।

নতুন বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১৯০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের মার্কিন-ভারত বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদি ২০২৫ সালের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্যায় নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই আলোচনায় মূলত বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক হ্রাস এবং পণ্য ও পরিষেবা সরবরাহ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘বাণিজ্য চুক্তির আলোচনার ঘোষণা ভারতের জন্য শুল্ক হ্রাসের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটি শুধু মার্কিন-ভারত সম্পর্ক নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল হয়ে পড়া ভারতীয় অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক।’

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা বাণিজ্য প্রায় শূন্য থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করতে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী বছর থেকেই ভারতের কাছে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি বাড়াবে। এর ফলে এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান সরবরাহের পথও উন্মুক্ত হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না। কুগেলম্যান মন্তব্য করেন, ‘এটি শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি বাড়লেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে স্পর্শকাতর প্রযুক্তির হস্তান্তর বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো হয়তো এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।’

মোদি টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এই বৈঠকে মাস্কের স্টারলিংক পরিষেবা ভারতে চালু হওয়া বা টেসলার বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। মাস্ক সরাসরি স্পেকট্রাম বরাদ্দ চেয়েছেন। অন্যদিকে ভারতীয় বিলিয়নিয়ার মুকেশ আম্বানির পছন্দ নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ।

তবে সফরের সফলতা-ব্যর্থতা যাইহোক নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আসন্ন কোয়াড নেতাদের সম্মেলনের জন্য ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চলতি বছরই কোয়াড বা কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কোয়াড) এর সম্মেলন হবে দিল্লিতে। এবার চতুর্দেশীয় জোটের শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত