গত বছরের ২৮ আগস্ট। সোমবার বেলা ১১টার একটু বেশি। দমদম এয়ারপোর্ট রোড ধরে কলকাতা যাওয়ার পথে কাঁকুড়গাছির রামকৃষ্ণ সমাধি রোডে বাসা তার। কথা হলো দীর্ঘক্ষণ। উষ্কখুষ্ক মাথার চুল, শীর্ণকায় দীর্ঘাঙ্গী পুরুষ। পরনে অতি সাধারণ পোশাক। ফতুয়া আর পাজামা। কয়েক মাস আগেই ছিলেন ভীষণ অসুস্থ। এখন শরীরে কিছুটা জোর ফিরে পেয়েছেন। এই ৮২ বছর বয়সেও শুধু মনের জোরেই কথা বলেন উচ্চ স্বরে। কখনো হাসেন আবার কখনো গম্ভীর। পরিচয় জানাতেই দুর্বল শরীরে হো-হো করে হেসে উঠলেন। দীর্ঘ স্বরে আস্তে বললেন, আ-হা, কত বছর আগে যে তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে? ঢাকার সেই জাদুঘর মিলনায়তনে! আর তো যাওয়া হলো না বাংলাদেশে। জানো, ওই দেশটা আমাকে ভীষণ টানে। পারি না, শরীর কিছুতেই নেয় না। মনে হয় বাপ-ঠাকুরদার ভিটেটা একবার দেখে আসি। আচ্ছা, বলো তো আমার ‘বরিশাল’ কেমন আছে? সেই কীর্ত্তনখোলা নদী! কবে যে দেখেছি, ঠিকমতো মনেও করতে পারি না। এখন তো বয়স হয়েছে।
১৯৪২ সালের ২৫ জুন অবিভক্ত বাংলার বরিশালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। বাবা প্রভাতচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। মা বাণী মুখোপাধ্যায় ও প্রতুলকে নিয়ে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে চলে যান তারা।
বললেনÑ ১৯৪২ থেকে পথ হাঁটছি। সেই গুটিগুটি পায়ে পথ চলতে চলতে পেয়েছি দীর্ঘ পথের সন্ধান। হাঁটছি এখনো। এর মধ্যে কত যে চড়াই-উতরাই। কবে চলে যাব কে জানে? জানো, শরীর বলছে হয়তো বেশিদিন আর নেই!
তার আশঙ্কাই সত্যি হলো। গতকাল সকালে ৮৩ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বিস্ময় জাগানিয়া জীবনবোধের এই শিল্পী। সরকারি হাসপাতালের মেইন ব্লকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার জন্য গঠন করা হয়েছিল মেডিকেল বোর্ড। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়মিত চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। তবু... প্রতুল মুখোপাধ্যায়। যাকে আমরা জানি নিজস্ব কণ্ঠের মানুষ হিসেবে। শুধু কণ্ঠস্বর দিয়েই মানুষকে করে রেখেছিলেন মন্ত্রমুগ্ধ। কী যে অসাধারণ গায়কী তার! কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই। হাতের আঙুল-মুখ-ঘাড়-পা নাচিয়ে ঠিক রাখেন তাল ও লয়। কখনো শব্দ করেন মুখ দিয়ে। একই সঙ্গে কণ্ঠের কারুকাজ। তার গান শুনে মানুষ কখনো হয়ে উঠেছেন নস্টালজিক, কখনো বা তীব্র প্রতিবাদী। আবার কখনো তিনি গানের বাণী-সুরে ঢেলে দিয়েছেন জীবনবোধের অনিন্দ্য আশ্চর্য প্রেমবোধ! সে এক বিমূর্ত অনুভূতি। ভাষায় প্রকাশ দুরূহ।
যন্ত্র-সংগীতের কোলাহলে গানের বাণী ও সুরকে হারাতে দেননি। বললেনÑ ছোটবেলা থেকেই কীভাবে যে এই অভ্যাস গড়ে উঠল! আর হবেই না কেন, আমাদের বাড়িতে তো হারমোনিয়াম-তবলা ছিল না। একা একাই নিজের যা কিছু আছে তাকেই গানের সঙ্গী করেছিলাম। ওমা! দেখি কী মানুষ ওটাই পছন্দ করছে! বাহবা দিচ্ছে। কেউ কেউ বলছে এভাবেই গেয়ে যাও। এটাই ভালো। বললেন আমাদের বাংলা গানে এ রকম কেউ না থাকলেও বিদেশে কিন্তু অনেকেই আছেন। বাদ্য-বাজনা ছাড়া ওরা শুধু কণ্ঠ দিয়েই গান করছে। আমরা পারছি না, কারণ চেষ্টাও করছি না।
গান করতে করতে কখনো কখনো মনে হয়েছে আমি আর আমার মধ্যে নেই। তখন কে যে কোথায় নিয়ে যায় জানি না? সে এক অদ্ভুত বিস্ময়! নিজেকে এ নিয়ে অনেকবার প্রশ্ন করেছি। উত্তর পাইনি কোনো। আমি তো গানে প্রশিক্ষিত নই। যা ভাবি, তাই গাই। কণ্ঠে সেই শব্দগন্ধের সুর নিয়ে আসার চেষ্টা করি। আমি চাই যে গান গাইছি, মানুষ তা উপলব্ধি করুক। যে কারণে সব সময় গানের বাণীকেই গুরুত্ব দিই। আর সুর হচ্ছে হৃদয়কে স্পর্শ করার বিষয়। আরেকজনকে ভাবনার জগতে নেওয়ার বিষয়। এই দুয়ের মিল হলেই শুধু মানুষ থিতু হয়। তখনই মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায়। অবশ্য সেখানে আমার কণ্ঠের গুরুত্ব কতটুকু, তা বলতে পারব না।
কথা প্রসঙ্গে বললেন, এখন বাংলাদেশ থেকে কেউ ডাকে না। ফলে যাওয়াও হয় না। কোনো দিন আর যাওয়া হবে কি না জানি না। যদি না যাওয়া হয়, তবে এটাই হয়তো আমার শেষ কথা তোমাদের সঙ্গে! শোনো, সংগীতকে ভালোবাসবে। তাহলে জীবনকে ভালোবাসা যায়। জীবনকে ভালোবাসলে মানুষকে ভালোবাসা যায়। আর মানুষকে ভালোবাসলে মানবজন্ম সার্থক হয়। এটা কখনো ভুলো না। ঈশ্বর আমার কণ্ঠে যদি কোনো সুর দিয়ে থাকে, তা তারই দান। আমি শুধু গেয়ে যাই। কী হয় জানি না!
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের সংখ্যা ৩ শতাধিক। তার গাওয়া আলু বেঁচো ছোলা বেঁচো/ বেঁচো বাকরখানি / বেঁচো না বেঁচো না বন্ধু/ তোমার চোখের মণি, আমি বাংলায় গান গাই/ আমি বাংলার গান গাই/ আমি আমার আমিকে চিরদিন / এই বাংলায় খুঁজে পাই, ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার ওয়াকত / বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায়/ বরকতের রক্তসহ (আল মাহমুদের কবিতা) অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন আবার গান গাইবেন, উদ্দীপ্ত করবেন শ্রোতাকে। এই শ্রোতাই এক দিন স্বপ্নডিঙ্গায় ভাসাবেন দেশের সাধারণ মানুষকে। যে পথ শুধু শান্তি-সুন্দরের। তা আর হলো কোথায়? এখন তিনি অনন্ত পথের যাত্রী...। এভাবেই সমস্ত মানুষকে যেতে হয় সময়ে-অসময়ে।
