কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। ২০২৯ সাল নাগাদ এ বন্দর পুরোদমে চালুর আগেই শুরু হয়েছে পলি নিয়ে ভাবনা। দুই বছরেই ১৪ কিলোমিটার চ্যানেলের বিভিন্ন জায়গায় পলি জমে পানির গভীরতা (ড্রাফট) কোথাও ১৬ মিটার থেকে কমে ১০ মিটারে নেমে এসেছে। এই চ্যানেল সচল রাখতে ড্রেজিং বাবদ বন্দরের বছরে খরচ হবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ২৬ এপ্রিল ১৩ মিটার ড্রাফটের (পানির গভীরতা) কয়লাবাহী জাহাজ ভেড়ানোর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দরের যুগে প্রবেশ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। এর পর থেকে প্রতিটি জাহাজে গড়ে প্রায় ৬৪ হাজার টন কয়লা নিয়ে মাসে দুটো করে জাহাজ ভেড়ে মাতারবাড়ীতে। গতবছর কয়লাবাহী জাহাজ ভিড়িয়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চালুর দুই বছরের মাথায় ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম চ্যানেলে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় এখন ড্রেজিং করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে চ্যানেলটি রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব জাহাজ ‘খনক’ দিয়ে খননও শুরু করেছে। গতমাসে প্রথম দফায় চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের পর এখন আবারও তা শুরু হয়েছে। ড্রেজিং প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মোহাম্মদ শামসিত তাবরীজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার চ্যানেলের (সাগর থেকে জেটিতে আসার পথ) বিভিন্ন পয়েন্টে কম বেশি পলি জমেছে। তবে ব্রেক ওয়াটার (সাগরের ঢেউ থেকে চ্যানেল ও জেটি রক্ষার বাঁধ) অংশে পলি জমার হার একটু বেশি হয়েছে।’
এদিকে কয়লা বিদ্যুৎ (কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পনি বাংলাদেশ লিমিটেড- সিপিজিসিবিএল) প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা কৃত্রিম এই চ্যানেলটি ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের সময় চ্যানেলের ড্রাফট ছিল ১৬ মিটার।
দুই বছরের মাথায় চ্যানেলের ড্রাফট কমে গেল কেনÑএ প্রশ্নের জবাবে চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মোহাম্মদ শামসিত তাবরীজ বলেন, ‘ব্রেক ওয়াটার ও চ্যানেলটি এখনও স্থিতিশীল হয়নি। তাই পলি জমছে। এ ছাড়া সাগর থেকে জোয়ার ও জাহাজের সঙ্গে আসা পলি বের হওয়ার সুযোগ নেই। তাই পলি জমছে এবং পলি জমাটা স্বাভাবিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘পলি জমার হাত থেকে চ্যানেলটি রক্ষা করতেই আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছি। এখন যেহেতু কয়লবাহী জাহাজের জন্য সর্বোচ্চ ১৩ মিটার ড্রাফট প্রয়োজন, তাই আমরা এই ড্রাফট নিশ্চিত রাখার জন্য ড্রেজিং করছি। ২০২৯ সালে বাণিজ্যিকভাবে বন্দরের কার্যক্রম শুরু হলে ১৬ মিটার ড্রাফট প্রয়োজন হবে। তখন হয়তো বাকি ড্রাফট নিশ্চিত করা যেতে পারে।’
কিন্তু মাতারবাড়ীতে কয়লবাহী জাহাজ ভেড়ানো বাবদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বছরে গড় আয় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া বন্দর চ্যানেলের জন্য সিপিজিসিবিএলের দেনা সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল বিগত সরকার। বর্তমানে আয়বিহীন একটি প্রকল্পে এত দেনা নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য বোঝা কি না জানতে চাইলে চিফ হাইড্রোগ্রাফার মোহাম্মদ শামসিত তাবরীজ বলেন, ‘বোঝা যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন চ্যানেল সচল রাখতে হবে।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘ড্রেজিং বাবদ ব্যয়ভারের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে সমাধান চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় যেভাবে সমাধান দেবে আমরা সেভাবেই কাজ করব। তবে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের আওতায় চ্যানেল সক্রিয় না থাকলে পরবর্তীতে খরচ আরও বেড়ে যাবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকার) অর্থায়নে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৬ মিটার ড্রাফট (গভীরতা) এবং ২৫০ মিটার চওড়া চ্যানেল নির্মাণ হয় বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায়। কয়লা বিদ্যুতের চ্যানেলের ওপর ভিত্তি করে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা যায় উল্লেখ করে জাইকা একটি প্রস্তাবনা দেয়। সেই প্রস্তাবনা ও পরবর্তীতে সমীক্ষার পর ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। আর এরই আওতায় চ্যানেলের চওড়া ১০০ মিটার বাড়ানোর পাশাপাশি গভীরতাও ১৮ মিটারে উন্নীত করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এ জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার টাকার বাজেট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) থেকে অনুমোদন করে। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ ৫ হাজার টাকা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (নিজস্ব তহবিল) ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা ২০২৯ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। মাতারবাড়িতে ৩৫০ মিটার দীর্ঘ ও ১৬ মিটার ড্রাফটের (পানির গভীরতা) জাহাজ ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ২০০ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। মাতারবাড়ী চালু হলে এর সঙ্গে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে নেটওয়ার্ক আরও বাড়বে। ফলে গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব পূরণ করবে মাতারবাড়ী বন্দর।
