বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, আইএমএফের অর্থ ছাড়াই আমাদের রিজার্ভ বাড়ছে। আমাদের মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে, এখন পর্যন্ত ২৪ শতাংশ গ্রোথ, যেটা এ মাসে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। আশা করছি এ বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার আসবে রেমিট্যান্স থেকে। তবে দুবাই থেকে একটি চক্র রেমিট্যান্স ডলারকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করছে। অথচ দুবাইয়ের তুলনায় সৌদিতে প্রবাসী বেশি, আমরা এটাকে পাত্তা দিচ্ছি না। এক কথায় বলতে পারি আমাদের রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে চিন্তা নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামে আয়োজিত ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান এবং পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইআরএফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মানিক মুন্তাসির।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পাচার করা অর্থ নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তাহলে আমরা কেন পারব না। অ্যাঙ্গোলা তাদের পাচার হওয়া ১৫ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে এনেছে, যেখানে তাদের পাঁচ বছর সময় লেগেছে। নাইজার, শ্রীলঙ্কা পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে এনেছে। আমরা এক বছরে কতটা পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারব জানি না তবে একটা ম্যাক্সিমাম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। পরের সরকারও যেন এটার ধারাবাহিকতা রাখতে পারে।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের অর্থনীতি এত চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা ছিল যা অন্য কোনো দেশে হয় না। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এক বছরে সম্ভব না। এখানে সরকারের রাজস্ব ব্যর্থতা ছিল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল, রিজার্ভ পতন ও মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা ছিল। এখানে রাজস্ব ব্যর্থতার বিষয়টা সহসা সমাধান হওয়ার না, সংস্কার দরকার। আমাদের দেশের নাগরিকরা ৪ লাখ পয়েন্টে ট্যাক্স দেয় কিন্তু আসে মাত্র ২৪ হাজার পয়েন্ট থেকে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে গভর্নর বলেন, দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি একদিনে হয়নি। এটা কমাতে অন্তত ১২ থেকে ১৬ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। আমরা মাত্র ৬ মাসের মতো সময় পেয়েছি, এতেই কমতে শুরু করেছে মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি আগামীতে আরও কমবে। ট্রেজারি বিল বন্ডে আগে এমডিরা বিনিয়োগ করত এখন ট্রেজারি বিলের সুদহার কমেছে। এখন এমডিদের ঘুম নষ্ট হয়ে যাবে কারণ তাদের লোন দিয়ে প্রফিট করতে হবে। আমরা চাই যে লোন দিয়ে প্রফিট হোক। কারণ ইতিমধ্যে ১২ শতাংশ থেকে ট্রেজারি বিল বন্ডের সুদহার ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ব্যাংক খাত সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, খাত সংস্কারের আগে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে সাজাতে চাই। বাংলাদেশ ব্যাংক এমন হবে, যেটা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন হবে যেখানে সরকারনির্ভরতা থাকবে না। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আগামী ৪ থেকে ৫ মাসের মধ্যে আমরা এটা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে যাব। তবে এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লোকবলের সংকট রয়েছে।
বিনিয়োগ কম হওয়া বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হওয়ার অন্যতম কারণ আমানত প্রবৃদ্ধি কম। সুদহারের কারণে বিনিয়োগ কমেছে এটা ভুল তথ্য। তবে বিনিয়োগ আসেনি এটা ঠিক না। সাড়ে ৭ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এর মানে বছরে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আমানত বাড়ছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা সরকার নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এখন তা কমিয়ে সরকার ৯৯ হাজার কোটি টাকা করেছে। আমরা বলেছি এটা ৯০ হাজার কোটি টাকা করতে। এর ফলে আগামীতে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে। ব্যাংকগুলোর এমডিদের ঘুমিয়ে থেকে মুনাফা করার দিন শেষ হয়ে আসছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার না কমালেও সুদহার কমবে।
সুদহার কমানো বিষয়ে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমে এলে সুদহার কমে আসবে। সুদহার কমতে শুরু করেছে। এখন সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশে এসেছে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি কাজ করছে। তবে পুরোপুরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া নীতির ফল আসতে এক বছর সময় লাগবে।
এ সময় তিনি বলেন, একটা গ্রুপ যদি একটা ব্যাংক থেকে ৮৭ ভাগ নিয়ে যায় তাহলে সে ব্যাংককে কীভাবে বাঁচানো যায়। তবে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে, ব্যাংকগুলোও নিজেরা আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে ফিরেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক থেকে একটা গ্রুপ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। সেই ইসলামী ব্যাংক এখন নিজেরাই দাঁড়িয়েছে। তারা আমানত বাড়িয়ে এখন ঋণ বিতরণ করছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে দৃশ্যমান কিছু একটা দেখাতে হবে। যাতে পরবর্তী সরকার এ বিষয়ে এটার ধারাবাহিকতা রাখে। তাছাড়া ব্যাংক খাত সংস্কারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ না থাকে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে সুদহার বাড়ানোর সঙ্গে বিনিয়োগের বাধাকেও দূর করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
