রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানকালে ‘গুলি বিনিময়ে’ দুই যুবক নিহত হয়েছে। গত বুধবার রাতে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলছে, নিহত মো. জুম্মন (২৬) ও মিরাজ হোসেন (২৫) ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসী’। স্থানীয় লোকজন তাদের কিশোর গ্যাং গ্রুপ ‘ঠোঁটে ল’র সদস্য হিসেবে ‘শনাক্ত’ করেছেন।
অন্যদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, চাঁদ উদ্যান এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন তথ্যে যৌথ বাহিনীর একটি টিম ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করে। সে সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা একটি গলির দুই পাশে ঘেরাও করলে সন্ত্রাসীরা একটি একতলা ভবনের ছাদ থেকে আভিযানিক দলটির ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। আভিযানিক দলটি আত্মরক্ষার্থে তৎক্ষণাৎ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ সময় পাঁচ সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয়। পরে বাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে ছাদের ওপর থেকে দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। আটকদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি এবং একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করার বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেন, তারা শ্রমজীবী লোক। তারা ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া। তারা ভ্যানচালক ও নির্মাণশ্রমিক।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের ৬ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, উৎসুক বাসিন্দারা বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক বাসিন্দাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তবে কেউ কেউ আবার এই গ্রুপের অন্য সদস্যদের হামলার আশঙ্কাও করছেন।
নিহতদের বিষয়ে স্থানীয়রা বলেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত দুজন চাঁদ উদ্যান এলাকার ভয়ংকর কিশোর গ্যাং ‘ঠোঁটে ল’ গ্রুপের সদস্য। ঘটনাস্থল থেকে আটক হওয়া পাঁচ সদস্য এই এলাকার আরেক ভয়ংকর কিশোর গ্যাং গ্রুপ ‘লাল ও ডায়মন্ড’ গ্রুপের সদস্য। তবে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, বসিলা ৪০ ফিট, সাত মসজিদ হাউজিং ও সোনা মিয়ার টেক এলাকার কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলো একসঙ্গে হয়ে যৌথ বাহিনীকে চারপাশ থেকে ঘিরে হামলা চালায়। এ সময় পুরো কিশোর গ্যাং গ্রুপ ‘ঠোঁটে ল’ গ্রুপের প্রধান দ্বীন ইসলাম ওরফে দিলা, ফাডা আলামিনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে গুলিবর্ষণ করে। যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির সময় দুজন নিহত হলেও দিলা ও ফাডা আলামিনসহ অনেকে পালিয়ে যায়।
স্থানীয়রা আরও জানান, এই এলাকা জুড়ে বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা দিনের আলো কিংবা রাতের আঁধারে যেকোনো সময় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করে সব ছিনিয়ে নেয়। পাশাপাশি প্রতিদিনই ১৫-২০ জন একত্র হয়ে এদের অস্ত্রের মহড়া চলে। কেউ তাদের ভয়ে মুখ খুলতে চায় না। কেউ মুখ খুললেই তার ও পরিবারের সদস্যদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নৃশংসতা। এমনকি গত বুধবার দিনের বেলায় একাধিকবার অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে তাদের।
বাড়িটির ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা বকুল বেগম বলেন, ‘বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে শুনতে পাই বাড়ির চালের ওপর দৌড়াদৌড়ির শব্দ। এ সময় বাড়ির চারদিকে সেনাবাহিনী ঘেরাও করে। তখন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সবাইকে যে যার বাসার ভেতরে দরজা, জানালা ও লাইট বন্ধ করে দিতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পর শুনতে পাই সেনাবাহিনী বলছে, আপনারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টার মতো সেনাবাহিনী তাদের অনেক রিকোয়েস্ট করে। একপর্যায়ে গুলির শব্দ শুনতে পাই। রাত প্রায় ২টা থেকে আড়াইটার দিকে বাসার চালের ওপর থেকে দুজনের মরদেহ নামানো হয়। এ ছাড়া বাড়ির দোতলায় ছোট রুমে ভাড়া থাকা পাঁচজনকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি সাত বছর ধরে এ বাড়ির ম্যানেজার হিসেবে আছি। যারা মারা গেছেন, তারা পাশের এলাকায় থাকতেন। কিন্তু তাদের চিনি না।’
৫ নম্বর রোডের শাহাবুদ্দিন নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘যারা মারা গেছে, তারা সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এরা বিকেলে ছুরি-চাপাতি নিয়ে রাস্তা দিয়ে মহড়া দিয়ে গেছে। এরা প্রতিনিয়ত ছিনতাই করত। আতঙ্কে এই এলাকার লোকজন সন্ধ্যার পর চলাচল করতে পারত না।’
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগ মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা জানান, যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহতদের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া যাদের ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
