বাজল জেলেনস্কির শেষের ঘণ্টা!

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৩১ এএম

দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন ট্রাম্প, তার মধ্যে অন্যতম ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান। ইতিমধ্যে সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে নতুন ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে সৌদি আরবের রিয়াদে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দল। আর এ বৈঠকের পরপরই ট্রাম্প ইউক্রেন বিষয়ে নিজের অবস্থানে পরিবর্তন এনেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তিত ইউক্রেন নীতির কারণে শঙ্কায় আছেন ইউরোপীয় নেতারা। ফলে যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

জেলেনস্কিকে দোষারোপ

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে একনায়ক বলে কটাক্ষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার একই বক্তব্যে জেলেনস্কিকে প্রচ্ছন্ন হুমকির সুরে বলেছেন, শান্তি নিশ্চিতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো দেশেই হারানোর ঝুঁকিতে আছেন তিনি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, নির্বাচন ছাড়া একজন স্বৈরশাসক জেলেনস্কির দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, না হলে তার আর কোনো দেশ থাকবে না। এ দিয়ে টানা দুদিন ইউক্রেন ইস্যুতে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করলেন ট্রাম্প। এর আগে, ২০২২ সালে শুরু হওয়া রুশ আগ্রাসনের জন্য কিয়েভকে সরাসরি দায়ী করেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতার এক মাস পূরণ হতেই হোয়াইট হাউজের দীর্ঘদিনের রুশ নীতিতে পরিবর্তন এনেছেন ট্রাম্প। তাতে একদিকে যেমন ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে শান্তি আলোচনায় ইউক্রেনকে পশ্চাৎপদ রাখার শঙ্কাও বাড়ছে।

ট্রাম্পের এ বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কিয়েভ। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রিই সিবিহা বলেন, আমাদের দেশ বিকিয়ে দেওয়ার জন্য অন্য কেউ জোর খাটাতে পারে না। আমাদের আত্মরক্ষার্থে লড়াই করার অধিকার রয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে তিরস্কারের পাশাপাশি এ যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। জেলেনস্কিকে কৌতুকাভিনেতা আখ্যায়িত করে ট্রাম্প বলেন, একজন বিনয়ী সফল কৌতুক অভিনেতা যুক্তরাষ্ট্রকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে রাজি করিয়েছেন। তিনি শুধু বাইডেনকে ব্যবহারের কাজটাই ভালোভাবে করতে পেরেছেন। নিজের একই সঙ্গে জেলেনস্কির রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোই উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

তবে জেলেনস্কিকে একনায়ক বলার সমালোচনা করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ। দেশটির সংবাদমাধ্যম স্পিগেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের মন্তব্যকে ভুয়া ও বিপজ্জনক বলেছেন তিনি। এ ছাড়া কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের মধ্যেও অনেকে জেলেনস্কিকে একনায়ক বলা এবং যুদ্ধের দায় ইউক্রেনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত বক্তব্যে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তবে সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছেন তারা।

ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের দূত

ইউক্রেনকে ছাড়াই সৌদি আরবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। সে বৈঠকের পর এবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে পৌঁছেছেন ট্রাম্পের ইউক্রেনবিষয়ক দূত কিথ কেলোগ। কিয়েভে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রয়োজনীয়তা বোঝে। তিনি ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছেন। সেই সঙ্গে সফরে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও সাক্ষাতের পরিকল্পনা আছে তার। কেলোগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক। কিন্তু যুদ্ধোত্তর কোনো সম্ভাব্য শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন করা হবে না বলেও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন তিনি। তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের মতো সহায়তা করার অন্যান্য উপায় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন কিথ কেলোগ।

কী বলছে ইউরোপ

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে একটা সমঝোতায় উপনীত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে আটলান্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে তার প্রশাসন। ট্রাম্পের এমন সব পদক্ষেপ ইউরোপের নেতাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ইউরোপীয় নেতারা। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না বলে মন্তব্য করেছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বুধবার সংঘাত এবং ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থনের বিষয়ে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য ইউরোপীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বুধবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ফ্রান্সের সরকারের মুখপাত্র সোফি প্রাইমাস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই আমাদের মিত্র রয়ে গেছে, তবে আমাদের নিরাপত্তার জন্য তাদের ওপর আর নির্ভর করতে পারি না। ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান টানাপড়েন ও সম্পর্কের অবনতির মধ্যেই এ মন্তব্য করল ইউরোপীয় পরাশক্তি এই দেশটি।

সোফি প্রাইমাস বলেন, নিজের সুরক্ষার জন্য অন্য শক্তির কাছে তার নিরাপত্তা অর্পণ করতে পারে না বলে ইউরোপ উপলব্ধি করছে। এ ছাড়া ইউরোপের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষমতা ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। এর আগে, গত সোমবার প্যারিসে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকের পর দেওয়া বিবৃতিতে প্রাইমাস ইউক্রেনের সঙ্গে সংহতি এবং একটি শক্তিশালী ও টেকসই শান্তি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এমনকি আলোচনায় ইউরোপ এবং ইউক্রেনের উপস্থিতি ছাড়া কোনো স্থায়ী শান্তি অর্জিত হবে না বলেও জোর দিয়ে জানান তিনি। ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক, ইউক্রেনের পরিস্থিতি, সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর আমন্ত্রণে প্রধান বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের নেতারা সোমবার প্যারিসে জড়ো হয়েছিলেন।

রাশিয়ার হাতে ট্রাম্পকার্ড

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায়। বর্তমানে ইউক্রেনের ভূখণ্ডের এক-পঞ্চমাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে মস্কো, প্রধানত দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে। শিল্পসমৃদ্ধ দনবাসের বেশিরভাগ অংশসহ ইউক্রেনের যুদ্ধ-পূর্ববর্তী মানচিত্রের প্রায় ২০ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ ভূখণ্ড এরই মধ্যে দখলে নিয়ে নেওয়ায় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় রাশিয়াই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বুধবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শান্তি আলোচনায় তাস রাশিয়ার হাতে রয়েছে। ফ্লোরিডায় সৌদি-পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এক বিনিয়োগ সম্মেলনে ভাষণ দিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেরার পথে বিবিসিকে এ সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। এর আগে রুশ সরকারের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছিলেন, যেকোনো ধরনের শান্তি আলোচনা সফল হতে হলে মস্কোর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে ইউক্রেন

যুদ্ধ শুরু পর থেকে ইউক্রেনকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি মস্কোকে চাপে রাখতে সাবেক জো বাইডেন প্রশাসন নানা নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল। তবে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বদলে গেছে চিত্র। এর মধ্যে বুধবার কিয়েভে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ প্রায় শেষের পথে। জেলেনস্কি জানান, সরাসরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ সম্ভব না হলে ইউক্রেনের নিজস্ব উৎপাদনের অনুমতি পেতে তিনি আবেদন করেছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ২০টি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে জেলেনস্কি। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, গ্রাফাইট, ইউরেনিয়াম, টাইটানিয়াম, লিথিয়ামসহ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ৫০ শতাংশ মালিকানা ছাড়া ইউক্রেনে সহায়তা পাঠানো হবে না।

ইউক্রেনীয় অভিবাসীদের আবেদনপত্র স্থগিত

ইউক্রেন ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের আবেদনপত্র গ্রহণ স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেন-যুগের কিছু প্রকল্পের আওতায় এসব দেশ থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীরা আবেদন করতে পারত। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা এবং একটি অভ্যন্তরীণ নথির বরাতে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, জালিয়াতি ও নিরাপত্তার উদ্বেগের শঙ্কায় ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাইডেনের ‘ইউনাইটিং ফর ইউক্রেন’ নীতির আলোকে ইউক্রেনের প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার নাগরিককে স্বাগত জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বা বৈধভাবে বসবাস করার সুযোগ পেতেন ইউক্রেনীয় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত