যেমন হবে মুমিনের রমজান প্রস্তুতি

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:২০ এএম

রমজান মাস খুব কাছে। এ মাস অজস্র রহমত ও ফজিলতে ভরপুর। মুমিন বান্দারা এ মাসের অপেক্ষায় দিন গুনে। মহান আল্লাহ এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

মুসলমানরা এ মাসে দিনে রোজা আর রাতে তারাবির নামাজ আদায় করেন। এ মাসে মহান আল্লাহ রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেন এবং অভিশপ্ত শয়তানকে শেকলে আবদ্ধ করে রাখেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন রমজান মাস আসে তখন রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৮৯৮) অন্য হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৮৫)

অত্যধিক বরকত ও ফজিলতপূর্ণ এ মাস আমাদের খুব কাছে। এ মাসকে বরণ করার প্রস্তুতি কেমন হওয়া দরকার! আমরা যদি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে-সালেহিনদের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তারা কীভাবে রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। তারা রমজানের আগে থেকেই রমজানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সব ধরনের প্রস্তুতিই গ্রহণ করতেন। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাস থেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিতেন আর দোয়া করতে থাকতেন, ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাসে আমাদের বরকত দান করুন এবং (হায়াত বৃদ্ধি করে) আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁে ছ দিন।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ ২/১৬৫)

কেউ যদি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করতে চায়, তাহলে সেটার জন্য প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। কারণ সে যদি ভালোভাবে প্রস্তুতি না নেয় তাহলে সে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে সফলকাম হতে পারবে না। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে সফলকাম হওয়ার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক। আমরা যদি সাধারণ দুনিয়ার কোনো কাজের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, প্রত্যেক কাজের জন্য আগে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। কাজের তুলনায় প্রশিক্ষণ অনেক কষ্টের হয়ে থাকে। কর্মক্ষেত্রে যেন সে পরবর্তী কাজগুলো ভালোভাবে করতে পারে, সেজন্য এভাবে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অনেক বৈধ কাজকে তার জন্য অবৈধ করে দেওয়া হয়। যাতে প্রশিক্ষণ ভালো হয় এবং কর্মক্ষেত্রে গিয়ে ভালো ফলাফল করতে পারে। এজন্য মহান আল্লাহ আমাদের রমজান মাস দিয়েছেন প্রশিক্ষণ হিসেবে। আর সেটা হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জনের প্রশিক্ষণ। এজন্য দেখা যায়, রমজানের বাইরে যে কাজগুলো আমাদের জন্য বৈধ যেমন দিনের বেলায় পানাহার ও স্ত্রী সহবাস, এগুলোকে রমজান মাসে অবৈধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে করে বান্দা আল্লাহভীতির ব্যাপারে পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ নিতে পারে। আমরা যদি পবিত্র রমজানের পূর্ণ বরকত ও ফজিলত লাভ করতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রস্তুতিই কাম্য। পূর্ণ প্রস্তুতি না থাকলে মাঝপথে আমরা ছিটকে পড়তে পারি।

রমজানকে সামনে রেখে আমরা যে সব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি সেগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো। এক. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। আমার দ্বারা যদি কোনো গুনাহ হতে থাকে তাহলে তা ছেড়ে দিতে হবে এবং একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। তওবা অর্থ মহান আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। তওবা তিন বিষয়ের নাম। যথা : আগের গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, আগের গুনাহের ওপর লজ্জিত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেটার ওপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। দুই. বেশি বেশি তওবা-ইসতেগফার করা। তিন. জান্নাত-জাহান্নাম এবং মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। চার. রোজা, ইফতার ও সাহরির মাসআলা-মাসায়েল ভালোভাবে জেনে নেওয়া, যাতে করে অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে আমার রোজা নষ্ট হয়ে না যায়। পাঁচ. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রী ও অর্থকরী আগে থেকে যথাসম্ভব মজুদ করে রাখার চেষ্টা করা। যাতে করে রমজানে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। ছয়. রমজানের আগের মাসগুলোতে বিশেষ করে রজব ও শাবান মাসে কিছু কিছু রোজা রেখে রমজানের জন্য শরীর ও মনকে অভ্যস্ত করা। সাত. যে সব আসবাব সামগ্রী দ্বারা গুনাহ ও পাপ কাজ সংঘটিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলো নিজের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলা। আট. যে সব কাজ করলে আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়ে সেগুলো করা। নয়. নিজের পরিবার ও সন্তানাদের রোজা রাখার জন্য প্রস্তুত করা। দশ. রমজান ও রোজার ফজিলত সম্পর্কে পরস্পরের মধ্যে বেশি বেশি আলোচনা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের পূর্ণ  প্রস্তুতি গ্রহণ করে রোজাগুলো আদায় করার তওফিক দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত