গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব এবং অযৌক্তিক প্রকল্প ব্যয়ের মাধ্যমে ১৪ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গড়ে ব্যয় বেড়েছে ৭০ শতাংশ।
দেশের চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার উপায় খুঁজতে সরকার গঠিত টাস্কফোর্সের এক প্রতিবেদনে বিগত সরকারের দুর্নীতি সম্পর্কে শ্বেতপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণী সভায় গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়নে সুপারিশ তুলে ধরে ‘সংকট থেকে উত্তরণে টাস্কফোর্স’।
ওই সুপারিশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা; রপ্তানি, বিনিয়োগ ও শিল্প; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; শিক্ষা; স্বাস্থ্য; আর্থিক; সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ; যোগাযোগ অবকাঠামো এবং পরিবেশ ও জলবায়ুর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে টাস্কফোর্স। এ ছাড়া বিগত সরকারের দুর্নীতির প্রধান পথ হিসেবে আর্থিক খাত, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অযৌক্তিক কর ছাড় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটি সৃষ্টির বিষয়টি উঠে এসেছে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং উচ্চহারে বৈদেশিক ঋণের পরিবর্তে নমনীয় সুদে ঋণ গ্রহণের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে টাস্কফোর্স।
উল্লেখযোগ্য অন্য সুপারিশগুলো হলো— উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন এবং এর মান নিশ্চিত করা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করা; অপ্রয়োজনীয় করছাড় বাতিল; সরবরাহ ব্যবস্থায় বিদ্যমান ত্রুটি নিরসনে উদ্যোগ; তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্যান্য সম্ভাবনাময় শিল্পকে উৎসাহিত করা; বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সমন্বিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতি প্রস্তুত করা এবং রপ্তানি সহায়তা পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্র্যায়ের কমিটি গঠন করা।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্টের (কেন্দ্র ভাড়া) বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে কোনো বিল নেই- বিধান প্রবর্তনের জন্য ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারসের (আইপিপি) চুক্তিগুলো রিভাইস (পুনর্মূল্যায়ন) করার পরামর্শ দিয়েছে টাস্কফোর্স।
উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সুপারিশ হলো- কুইক রেন্টাল ও ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারসের স্থলে পর্যায়ক্রমে অধিকতর দক্ষ, টেকসই ও সাশ্রয়ী বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা; নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস; প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে জ্বালানিসংক্রান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস এবং অধিকতর স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া।
এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ক্রয় বা ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে করছাড় ও কর সুবিধা প্রদান করা; নবায়নযোগ্য শক্তিসংক্রান্ত প্রকল্পে স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের নিশ্চয়তা, জ্বালানি খাতের সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য সরবরাহের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় জ্বালানি ডেটাবেস (তথ্যভাণ্ডার) প্রতিষ্ঠা, জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা ও ক্রয়সংক্রান্ত তথ্যাদির প্রকাশ ও নিয়মিত পারফরম্যান্স অডিট পরিচালনা এবং সরকারি অবকাঠামো, যানবাহন ও শিল্পযন্ত্রের জন্য বাধ্যতামূলক জ্বালানি দক্ষতা মানদণ্ড প্রণয়নের সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সুপারিশ
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে বিভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থাকে একীভূত করে একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাসহ শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে ‘সংকট থেকে উত্তরণে টাস্কফোর্স’।
শিক্ষা খাতের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি করা; ‘নো পিএইচডি, নো প্রফেসর’নীতি বাস্তবায়ন, যার অর্থ হলো- পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া কেউ অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন না। এ ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উন্নত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিময় জোরদার করার সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।
শিল্পে ন্যায্য মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করা
রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং শিল্পের উন্নয়নে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স। যার মধ্যে অন্যতম হলো- শিল্পে ন্যায্য মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করা। অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- ব্যবসা সহজ করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার, সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যের জন্য বিশষ সহায়তা প্রদান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন।
এ ছাড়া দেশের শিল্পপার্কগুলোর মধ্যে উচ্চ গতির ট্রেন চালুর পরামর্শ দিয়েছে টাস্কফোর্স। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় শিল্প ও ব্যবসার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি, স্টার্টআপের বিকাশে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসায় বিদেশনির্ভরতা কমানো
চিকিৎসার জন্য বিদেশনির্ভরতা কমাতে স্বাস্থ্য খাতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধির পরামর্শের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নামের দুটি আলাদা বিভাগকে একীভ‚ত করার পরামর্শ দিয়েছে টাস্কফোর্স। এ ছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন, ডিজিটালাইজেশন ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, অপরিকল্পিত ব্যয় কমাতে সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নীতিমালা হালনাগাদ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে উদ্ভ‚ত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারকে।
আর্থিক খাতে পরামর্শ
এ খাতের উন্নয়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য একক ঋণগ্রহীতার এক্সপোজার সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ, প্রকৃত ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণ প্রদান কঠোরভাবে নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য অন্য সুপারিশগুলো হলো- খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বারবার রিশিডিউলিং এবং রাইটঅপ করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, দক্ষ জনবল দিয়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা।
কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে অনুন্নত অঞ্চলে ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের পরিবর্তে কৃষি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রগুলোয় ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা, ধান কাটার যন্ত্র ব্যবহার এবং সেচে আধুনিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা, সার আমদানির বিকল্প হিসেবে অভ্যন্তরীণ সার-কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন ও উন্নত করতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সারের মজুদ বৃদ্ধির ওপর তাগিদ দিয়েছে টাস্কফোর্স।
উল্লেখযোগ্য অন্যান্য পরামর্শের মধ্যে রয়েছে- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ রপ্তানি এবং এর বৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ
পরিবেশ ও জলবায়ুর উন্নয়নে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে টাস্কফোর্স। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ফিক্সড চিমনিযুক্ত ইটের ভাটাগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, একই সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ভ্যাট অব্যাহতি ও প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারকে।
অন্যদিকে পরিবেশ সারচার্জ প্রয়োগ; হাইব্রিড, বৈদ্যুতিক এবং হাইড্রোজেনচালিত যানকে উৎসাহিত করা, পানি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, ২০৩০ সালের মধ্যে একক ব্যবহারের প্লাস্টিক বন্ধ; শব্দনিয়ন্ত্রণ নীতির সঠিক প্রয়োগ; জলবায়ু-সহিঞ্চু কৃষি উন্নয়ন জোরদার, বন উজাড় ও ভ‚মিক্ষয় প্রতিরোধ এবং পরিবেশদূষণকারীদের আর্থিক প্রণোদনা বন্ধের পরামর্শও দিয়েছে টাস্কফোর্স।
এ ছাড়া যোগাযোগ অবকাঠামোতে জমি অধিগ্রহণে সময় কমানো, রাস্তার পাশের হাট-বাজার সরানো, সেতু তৈরিতে সঠিক নেভিগেশনাল ব্যবস্থা এবং যোগ্য ও দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
