নামের ভুলের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরে ২০১৬-১৭ সালে ছিলেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী শেখ মোহাম্মদ সেলিম। সম্প্রতি গুম হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমের মাধ্যমে নেওয়া তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফয়সাল খান
দেশ রূপান্তর : গুমের শিকার বেশিরভাগ মানুষের কোনো রাজনৈতিক কারণ হয়তো ছিল। আপনাকে কেন গুম করা হয়েছিল?
শেখ মোহাম্মদ সেলিম : আমার পরিবার বিএনপির সঙ্গে জড়িত। আমি নিজেও মালয়েশিয়ায় বিএনপি করি। আমি মাঝেমধ্যেই ফেসবুকে তৎকালীন সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতির সমালোচনা করে পোস্ট দিতাম। হয়তো এ কারণেই আমাকে গুম করা হয়েছিল; আমার এলাকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমাকে ধরিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। যখন আমাকে নির্যাতন করা হতো, তখন তাদের প্রশ্ন আমাকে অবাক করত। আমি বুঝতাম না আসলে আমার কাছে কী জানতে চাওয়া হচ্ছে। তারা বলত আমি শেখ মোহাম্মদ সেলিম, আমার পিতার নাম ও ঠিকানা আসল না। আমার বাড়ি গাজীপুর না, এটা আমার ফেক (নকল) নাম। কোটালীপাড়ায় (গোপালগঞ্জ) আমি নাকি বোমা পুঁতে রেখেছি, আমি নাকি পঞ্চগড়ে গিয়েছি। পরে জানতে পারি, একজনের নাম ছিল সেলিম। তিনি মালয়েশিয়ায় সেলিম নামের পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন। দেশে এসে গাজীপুরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। তাকে গ্রেপ্তারে বেশ কয়েকবার অভিযানও চালায় র্যাব। কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার মামলা ছিল তার নামে। ওই সেলিম ভেবেই আমাকে গ্রেপ্তার করে।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের লোকজন আয়নাঘর পরিদর্শন করেছেন, যার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আপনার কী মনে হয়?
শেখ সেলিম : ছবিতে রুমের গঠন দেখে বুঝেছি, পুরাতন রুমগুলোর কোনো একটাতে আমাকে রাখা হয়েছিল। তবে ঘোরানোর যে চেয়ার দেখানো হয়েছে, তাতে আমাকে ঘোরানো হয়নি, যদিও চেয়ারে বসানো হয়েছে। হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করেছে। তিনটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে টুপি পরানো হতো। যে পরিমাণ ট্রমার মধ্যে ছিলাম তাতে মনে রাখার মতো অবস্থায় ছিলাম না। সবকিছু চোখ বেঁধেই করা হতো, চেয়ারে বেঁধে ইচ্ছামতো পেটানো হতো, কারেন্টের শক দেওয়া হতো।
দেশ রূপান্তর : অনেকে আয়নাঘরের ছবি নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন...
শেখ সেলিম : ২০২২ সালে যখন আয়নাঘরের ঘটনা সামনে আসে, আমার মনে হয় ওইদিনই এটার সংস্কার শুরু হয় (আলামত নষ্ট করার কাজ)। দেয়ালে মানুষের বিভিন্ন লেখা, কেউ বাড়ির ফোন নম্বর লিখে রাখত, নাম-ঠিকানা লিখে রাখত, গুমের তারিখ লিখে রাখত, আরও অনেক কথা লেখা থাকত। ঘটনাগুলো স্পষ্ট। এখন যারা দেয়ালের নতুন রঙ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার, এর সঙ্গে জড়িত ‘সন্ত্রাসী কর্মকর্তারা’ সেসব বিষয় যাতে জাতির সামনে না আসে সেজন্য দেয়াল সংস্কার করতেই পারে। দেয়ালে রঙ করা, টয়লেট ভেঙে ফেলা, মাঝখানের ওয়াল ভেঙে ফেলা এগুলো খুব বড় কাজ নয়। মানুষ কতটা নিচে নামলে এ ধরনের জঘন্য একটা ঘটনা অস্বীকার করতে পারে! আমি তাদের ধিক্কার জানাই। তাদের বলতে চাই, ২০২২ সালে যখন আমি বলেছিলাম, তখন কেন আপনারা আয়নাঘরে যাননি! তখন কেন তারা দেখায়নি যে, এখানে কোনো বন্দি নেই।
দেশ রূপান্তর : আয়নাঘরে কীভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো?
শেখ সেলিম : জিজ্ঞাসাবাদের আগে চোখ বেঁধে ফেলত। আমাকে একবার কারেন্টের শক দেওয়া হয়। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর বুঝতে পারি, দুজন লোক আমাকে ধরে নিয়ে সেলে নিয়ে আসছে। যখন আমাকে নির্যাতন করত, তখন বুঝতে পারতাম না কোনদিক দিয়ে মারছে। একদিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে ওদিকে কাত হতাম, তখন আবার অন্যদিক দিয়ে আঘাত আসত। অনেক সময় হাত দিয়ে মারত চাপায়, ঘুসি দিত। কানের মধ্যে জোরে আঘাত করত। হাঁটুর মধ্যে এত জোরে আঘাত করত যে, লাঠি ভেঙে যেত।
দেশ রূপান্তর : থাকার জায়গা কেমন ছিল, কীভাবে ঘুমাতেন?
শেখ সেলিম : আমাকে প্রথম যেখানে রাখা হয় সেখানে দুজন লোক ছিল। তাদের একজন শেখ নূর, তার বাড়ি কক্সবাজারের আশপাশে, অন্যজন সিঙ্গাপুরপ্রবাসী। ওই সেলে মারধর করে আরেক সেলে স্থানান্তর করে, যেখানে বাড্ডার লিটন নামের একজন থাকত। একটা লোহার খাট ছিল, যেখানে বাড্ডার লিটন ঘুমাত। আমি থাকতাম নিচে। খুবই ছোট জায়গা, আমার পা আর মাথা দেয়ালে লেগে যাওয়ার মতো অবস্থায় শুতে হয়েছে। ফ্লোর ছিল স্যাঁতসেঁতে, নোংরা গন্ধ। ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা মনে হতো। সেলে দুটি দরজা ছিল, একটা লোহার আরেকটা কাঠের। বিশেষ সময়ে দুটি দরজাই বন্ধ করে দিত। যখন কাউকে টয়লেটে নিয়ে যেত তখন দুটি দরজাই বন্ধ করে দিত, যাতে কেউ কাউকে দেখতে না পায়। অন্য সময়ে কাঠের দরজা খোলা থাকত, শুধু লোহার দরজা বন্ধ থাকত।
দেশ রূপান্তর : ওখানে কারা কারা ছিল?
শেখ সেলিম : আমার বাম পাশে থাকত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের টিচার, এগজস্ট ফ্যান বন্ধ থাকা অবস্থায় ওনার সঙ্গে আমরা কথা বলতে পারতাম। আমার ডান পাশে সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন (আমাকে লিটন বলেছিল)। উনি কথা বলতেন না। জোরে জোরে দেয়ালে আঘাত করতেন। চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন। ডাক্তার আসত যে সেটা বুঝতে পারতাম। আমি যে সোহেলকে দেখেছি সে আমাকে জানিয়েছে, এখানে ইলিয়াস আলীকে রাখা হয়েছিল, বাড্ডার লিটনকে রাখা হয়েছিল, ইলিংশ মিডিয়ামের এক শিক্ষককে রাখা হয়েছিল। শত শত মানুষের কান্না আমি শুনতে পেয়েছি।
দেশ রূপান্তর : আপনার ওপর আর কোনো নির্যাতন হয়েছে?
শেখ সেলিম : বাম পাশের সেলে যিনি থাকতেন তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন না, ডান পাশের রুমে থাকতেন শাহান শাহ নামে একজন। পরে জেনেছি তিনি বংশালের যুবদল নেতা সোহেলের ভাই। আমাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো, আমি খুব জোরে জোরে কান্নাকাটি করতাম। তখন সোহেল ভাই আমাকে সান্ত¡না দিতেন। তিনি বলতেন, এখানে বিএনপির ইলিয়াস আলী থেকে শুরু করে তৎকালীন সরকারবিরোধী অনেক বড় নেতাকে রাখা হয়েছে। কাউকেই মারেনি, আপনাকেও মারবে না, মুক্তি পাবেন। সেলিম বলেন, অনেকেই ইলিয়াস আলীর কথা আলাপ করত। আমি যখন বের হই তখন পর্যন্ত ইলিয়াস আলী আয়নাঘরেই ছিলেন।
দেশ রূপান্তর : ২০২২ সালে আপনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ্যে আসে। স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলার জন্য আপনার ওপর হুমকি এসেছিল কি?
শেখ সেলিম : নেত্র নিউজের সঙ্গে যখন আমার যোগাযোগ হয় তখনই তারা আমার পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করে। আয়নাঘর নিয়ে আমার সাক্ষাৎকার প্রচারের পর তারা আমার পরিবারকে থ্রেট করে। গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা আমার বাসায় গিয়ে বাবা-মাসহ পরিবারের লোকজনকে হুমকি দিয়ে আসে। বলা হয়, আমি যে নাম্বার থেকে কল দিই সেটা যেন তাদের দেওয়া হয়। আমার পরিবারকে বলা হয়েছে, আমি সরকারের বিরুদ্ধে অনলাইনে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছি। বলা হয়, আমাকে মালয়েশিয়া নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনি মালয়েশিয়ায় ছিলেন, আপনার কি কোনো সমস্যা হয়েছিল?
শেখ সেলিম : মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আমাকে গোপনে খোঁজাখুঁজি করা হয়। এমবাসিতে পরিচিতজনরা আমাকে জানায়, এখানে আসবেন না, আপনাকে বন্দি করা হবে। বন্দি করে আপনাকে দেশে ফেরত পাঠাবে। মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও আমাকে থ্রেট করে। একপর্যায়ে দেশে আমার শ^শুরকে ডিবিতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে হুমকি দেওয়া হয়, আমি মুখ বন্ধ না করলে আমার স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। ফলে আমার স্ত্রী আমাকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয়। আমার আইনজীবী ভয়ে আমার মামলা পরিচালনা বন্ধ করে দেন।
দেশ রূপান্তর : কেন তারা এমনটি করেছে?
শেখ সেলিম : আমাকে ছেড়ে দিয়ে তারা বলেছে, বাইরে গিয়ে কোনো কথা বলবেন না। বললে আপনি ও আপনার পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলা হবে। এসব বলে আমাকে মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে আমাকে নিয়ে আসা হয়। ডিবি অফিসে এক মাসের মতো ছিলাম। একপর্যায়ে আমাকে কোর্টে ওঠানো হয়। পুলিশের আবেদনে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। এরপর আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আমাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এরপর আমাকে মারবে না, মামলা দুর্বল করে দেবে এসব কথা বলে আরও ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
দেশ রূপান্তর : ছাড়া পাওয়ার পরের জীবন কেমন হয়েছে?
শেখ সেলিম : ছাড়া পাওয়ার পরও প্রশাসন আমাকে নজরদারিতে রেখেছিল। কিছুদিন পরই আমার জামিন বাতিল করা হয়। তা না হলে আমি বিদেশে আসতাম না, দেশেই থেকে যেতাম।
দেশ রূপান্তর : তারা কেন এমন করেছে?
শেখ সেলিম : তাদের ভয় ছিল, আমি বিষয়টা নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বললে সরকার ফেঁসে যাবে। আয়নাঘরের কথা যাতে প্রকাশ্যে না আসে, সেজন্য আমাকে নজরদারিতে রাখত।
দেশ রূপান্তর : এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে আপনার চাওয়া কী?
শেখ সেলিম : আমার এখনো সোহেল ভাইয়ের কথা কানে বাজে। আমি সবার মুক্তি চাই।
