ব্যবহার ও পানযোগ্য নিরাপদ পানিকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে পানযোগ্য নিরাপদ খাবার পানি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে (পাবলিক প্লেস) বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
পাঁচ বছর আগে দেওয়া এ সংক্রান্ত রুল নিস্পত্তি করে বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানযোগ্য পানি নিশ্চিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) রুল দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেওয়া হয়।
এ রিট মামলাটিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে শুনানি ও মতামত দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ও আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মিনহাজুল ইসলাম। পানি নিয়ে হাইকোর্টের এ রায়টিকে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বলছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
রায়ে আদালত বলেন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানযোগ্য পানি পাওয়া একটি মৌলিক অধিকার এবং এ পানির অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপদ পানযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আদালত বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রত্যক গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেস অর্থাৎ আদালত, ধর্মীয় উপাসনালয়, হাসপাতাল, রেল স্টেশন, হাট বাজার, বিমানবন্দরসহ প্রত্যেক পাবলিক প্লেসে নিরাপদ পানযোগ্য পানি নিশ্চিত করতে হবে।
আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও পানযোগ্য পানি সাশ্রয়ী মূল্যে নিশ্চিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে সকল পাবলিক প্লেসে নিরাপদ পানি বিনামূল্যে সরবরাহে কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেই মর্মে সরকারকে একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
পাশাপাশি দেশের যত পানির উৎস রয়েছে যেমন পুকুর, খাল, বিল, নদী সেগুলো যাতে ক্ষয়িষ্ণু বা শুকিয়ে না যায়, পানি যেন অনিরাপদ ও দূষিত না হয়, সেগুলোকে সংরক্ষিত করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, আদালত এই রিট মামলাটি চলমান (কন্টিনেওয়াস ম্যান্ডামাস) রেখেছেন।
ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মানুষের রোগব্যাধির সবচেয়ে বড় কারণ দূষিত পানি। এতে করে রোগাক্রান্ত ব্যাক্তি ও রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হয়। অনেকে নিঃস্ব হয়ে যান। যেখানে নিরাপদ পানি নেই সেখানে জীবন হুমকির মুখে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই রায়টি ঐতিহাসিক, যুগান্তকারী ও মাইলফলক। আমরা যত উন্নয়নই করি না কেন তা টেকশই করতে মানুষের মৌলিক চাহিদা ও মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে নিরাপদ পানি নেই সেখানে জীবন হুমকির মুখে থাকে। আশা করি এ রায়ের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে নতুন চেতনার উদ্রেগ হবে।’ আইনজীবী আরও বলেন, ‘এই রায়ের আলোকে ব্যবস্থা নিলে পানি নিয়ে বানিজ্য বন্ধ হবে।’
