পবিত্র রমজান মাসে মানুষকে কল্যাণ ও তাকওয়ার পথে সহায়তার একটি অংশ হলো আর্থিক অনুদান। যা মানুষকে শ্রমসাধ্য ও ভারী কাজ কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। ফলে সহায়তাপ্রাপ্ত মানুষটি সহজে রোজা পালন, স্বস্তিতে তারাবি আদায়সহ নিবিষ্ট মনে ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারে। রমজানের দান ও সহানুভূতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, শায়খুল হাদিস ও জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফারাবী
দেশ রূপান্তর : রমজান মাসের দান-খয়রাত ও সহানুভূতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী : রমজান অন্য এগারো মাসের চেয়ে ভিন্ন। এ মাসে পুণ্যের পথে বেশি অগ্রসর হতে হয়। নবী করিম (সা.) রমজান মাসে অধিক দান করতেন। তিনি ছিলেন দানের ক্ষেত্রে উপমাহীন। তিনি মানুষকে দান করতেন দারিদ্র্যের ভয় না করে। একবার একজনকে দান করেছিলেন মাঠভর্তি ছাগল। এত বড় অনুদান পেয়ে লোকটি নিজ গোত্রের কাছে ফিরে বলেছিলেন, তোমরা মুহাম্মদের দ্বীনের ওপর ইমান আনো। তিনি এমনভাবে দান করেন, যেন দারিদ্র্যকে ভয় পান না। তিনি দানকে মনে করতেন স্থায়ী সম্পদ। একদিন ঘরে বকরি জবাই হলো। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, কতটুকু অবশিষ্ট আছে? ঘর থেকে বলা হলো, কাঁধের অংশটাই শুধু আছে। বাকিটা দান করা হয়ে গেছে। নবী করিম (সা.) বললেন, না বরং কাঁধের অংশ ছাড়া বাকিটা রয়ে গেছে। এমনই ছিল নবী করিম (সা.)-এর দানের হাত। রমজান মাসে রাসুল (সা.)-এর দানের সীমা-পরিসীমা থাকত না। রাসুল (সা.)-এর উম্মত হিসেবে আমাদেরও উচিত, তার আদর্শ অনুসরণ করা।
দেশ রূপান্তর : দান-খয়রাত তো মানুষ নানা নিয়তে করে। এ বিষয়ে কী বলেন?
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী : দান-খয়রাত ও পরোপকার করতে হবে একনিষ্ঠ নিয়তে, সদকায়ে জারিয়া হিসেবে। আমাদের দেশে বহু দাতব্য চিকিৎসালয় আছে, যেখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এ ধরনের আরও নানা প্রতিষ্ঠান আছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গরিব ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন, কেউ বয়স্কদের জন্য রাতের বেলা পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। কেউ অসহায় নারীদের সাহায্যের জন্য এনজিও খোলেন। ধনাঢ্যরা ঈদের সময় শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করেন। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। তাদের প্রশংসা করতেই হয়। তবে কেউ কেউ আছেন, যারা নাম কামানোর জন্য, নির্বাচনে জয় পাওয়ার জন্য দাতব্য কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য ফাউন্ডেশন তৈরি করে সেখানে টাকা বিনিয়োগ করেন। এগুলো অনুচিত।
দেশ রূপান্তর : আপনিও তো নীলফামারীর ডোমার-ডিমলা উপজেলায় সেবামূলক নানা কাজের সঙ্গে জড়িত, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী : দেখুন, আমার প্রথম পরিচয় হলো, আমি একজন মানুষ। এরপর আলেম ও রাজনীতিবিদ। আর জনসেবা ইবাদতের অংশ, যাকে বলা হয় ‘খেদমতে খলক’ তথা আর্তমানবতার সেবা। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই আমি এলাকার মানুষদের ভালোবাসা উপলব্ধি করেছি। পারিবারিক কারণে মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়েছে। বাবা জনপ্রতিনিধি ছিলেন, প্রতিনিয়ত মানুষ তার কাছে আসত। দেখতাম, ছোট ছোট সমস্যা আর প্রয়োজনে মানুষগুলো পেরেশান থাকত।
পড়াশোনা শেষে কর্মসূত্রে যখন সৌদি আরব ছিলাম, তখন থেকে শুরু হয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। এর মধ্যে যারা গরিব-দুঃখী তারা নানাভাবে সহযোগিতা চায়। আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করি, সবসময় মনমতো পারা যায় না। তারপরও আমি যদি কোনো দায়িত্ব পাই, সেটা আমানতদারির সঙ্গে পালন করি। মানুষের উপকার করার জন্য অনেককে জ¦ালাতন করি, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে এলাকার সমস্যার কথা বলে পাশে দাঁড়ানোর আবদার করি। এভাবেই এলাকায় প্রচুর টিউবওয়েল দিয়েছি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে সহায়তা করেছি। শীতবস্ত্র ও ইফতারসামগ্রী বিতরণ করেছি এবং এখনো করি। শুধু নিজ এলাকা নয়, দেশের যেখানেই দুর্যোগ দেখা দেয়, সেখানেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। ইনশাআল্লাহ, যতদিন সম্ভব মানুষের পাশে থাকব। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।
দেশ রূপান্তর : একজন রাজনীতিবিদের কোন গুণগুলো থাকা দরকার বলে মনে করেন?
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী : একজন রাজনীতিবিদকে শুধু নির্বাচনের হিসাব অর্থাৎ জয়-পরাজয় নিয়ে মাঠে থাকলে চলবে না। সর্বাবস্থায় মানুষের পাশে থাকা, কর্মসংস্থান ও দুর্যোগে তাদের পাশে দাঁড়ানো কাম্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে যা বাজেট আসে, তা সাধারণ মানুষের কাছে যথাযথ পৌঁছানো, সব ধরনের দুর্নীতি থেকে দূরে থাকা, যোগ্য লোকদের যোগ্য স্থানে আসতে সহায়তা করা আবশ্যক। একজন আলেম হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো, ইসলামের পক্ষে কথা বলা। ইসলামবিরোধী কোনো কিছু আসলে তা প্রতিরোধ করা। এ ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মাদ্রাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছে আমার আহ্বান থাকবে, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন। ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সুখী ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখুন।
দেশ রূপান্তর : রমজান উপলক্ষে দেশবাসীর কাছে কিছু বলতে চান?
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী : হ্যাঁ, শুধু একটা বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আমার-আপনার প্রতিবেশী অনেক মানুষ কষ্টসাধ্য কাজের কারণে রোজা রাখতে পারে না। আমাদের একটু সহযোগিতার দ্বারা এ মানুষগুলো বরকতময় মাসের বরকত লাভ করতে পারে। অনেক মানুষই অর্থের অভাবে সাহরি-ইফতারে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে না। আমাদের একটু সহযোগিতা তাদের সাহরি-ইফতার সহজ ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে। এভাবে আমরা খেয়াল করলে রমজানের বরকত সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ছুঁয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
