গভীর রাজনৈতিক সংকটে তুরস্ক

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৫, ১২:১১ এএম

তুরস্কের বিরোধীদলীয় নেতা একরেম ইমামোগলুকে গ্রেপ্তারের পর থেকে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপীয় দেশটি। সপ্তাহব্যাপী চলা এই বিক্ষোভ পরবর্তী সময়ে রূপ নেয় সরকারবিরোধী আন্দোলনে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তাই বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে দেশটির প্রশাসন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইমামোগলুকে গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়ায় দেশ জুড়ে বিক্ষোভ থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ মানুষকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিশ্ব জুড়েও নিন্দার ঝড় উঠেছে। তবে ইমামোগলুকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের বিবৃতিকে পক্ষপাতদুষ্ট অভিহিত করে তা খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

গত ১৮ মার্চ ইস্তাম্বুলের মেয়র ও সিএইচপি নেতা একরেম ইমামোগলুকে এক বিশেষ অভিযানে আটক করা হয়। এ ঘটনায় বিক্ষোভ শুরু করেন তার সমর্থকরা। দেশটির রাজধানী আঙ্কারাম ইস্তাম্বুলসহ বিভিন্ন শহরে তার মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ হয়। রবিবার তাকে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার দেখানোর পর তুরস্কের ৮১ প্রদেশের মধ্যে অন্তত ৫৫টি প্রদেশে বিক্ষোভ হয়েছে, যা দেশটির দু-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের সমান। বেশ কয়েকটি জরিপে জনপ্রিয়তায় এরদোয়ানকে ছাড়িয়ে যাওয়া ইমামোগলুকে এরই মধ্যে বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) তাদের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বানিয়েছে। তার গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছে সিএইচপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল। ইমামোগলুকে তুরস্কে এরদোয়ানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়।

বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী ও পশ্চিমা অনেক দেশ মনে করছে, নির্বাচনে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়া ইমামোগলুকে সরিয়ে দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এরদোয়ানের সরকার। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করে জানিয়েছে, এটি তুরস্কের গণতন্ত্রের জন্য একটি অন্ধকার সময়। তবে সরকার বলছে, বিচারব্যবস্থার ওপর তাদের কোনো হাত নেই এবং দেশটির আদালতগুলো স্বাধীন। ইস্তাম্বুলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার সময় তুর্কি বিচারমন্ত্রী ইলমাজ তুনচ ইউরোপীয় অংশীদারদের কাণ্ডজ্ঞান খাটিয়ে কাজ করতে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইমামোগলুর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, তার মাত্রা বিবেচনা করেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করতে চাই না, কিন্তু যদি আইনের লঙ্ঘন ঘটে, তখন তা করতেই হয়।’ তিনি আরও বলেন, অভিযোগগুলোর মাত্রা বিবেচনায় যদি তথ্যপ্রমাণ লোপাটের ঝুঁকি থাকে, তাহলে বিচার বিভাগকে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতেই হয়।

তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) নেতা ওজগুর ওজেল দেশটির প্রতিটি শহরে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেন, আগাম নির্বাচন আহ্বান অথবা ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে কারাগার থেকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত দেশটির প্রতিটি শহরে বিক্ষোভ চলবে। দেশ জুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল শনিবার ইস্তাম্বুলে বড় ধরনের বিক্ষোভ হবে। সিএইচপি চেয়ারম্যান ওজগুর ওজেল মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে তার দলের নেতা একরেম ইমামোগলুকে দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট করার জন্য প্রচারের সূচনা হবে।

ইস্তাম্বুলে দলের সদর দপ্তরে বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে ওজেল বলেন, ‘আমরা যে শহরেই যাব, সেখানেই তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমাবেশ হবে। একরেম ইমামোগলুর প্রতি আস্থা ও গণতন্ত্র আমাদের বিক্ষোভকে বৃহৎ ও শক্তিশালী করবে।’

এদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষের সমর্থন ধরে রেখেছেন। তিনি এ বিক্ষোভকে সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়েছেন। এরদোয়ানের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর হামলা করছে এবং জনগণের সম্পদ নষ্ট করছে। বিরোধী দলের এ কর্মকাণ্ড শেষ পর্যন্ত মøান হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের আইনি পরিণতি ভোগ করার হুমকিও দিয়েছেন এরদোয়ান। তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলী ইয়েরলিকায়া বলেছেন, গত বুধবার থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিক্ষোভ থেকে ১ হাজার ৮৭৯ জনকে আটক করা হয়েছে, তার মধ্যে ২৬০ জনকে রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। ৪৮৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, ৬৬২ জনের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিক্ষোভে দেড়শ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইমামোগলুকে মেয়র পদ থেকে বরখাস্তও করেছে কর্র্তৃপক্ষ। তার মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভের মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার ইস্তাম্বুলের অন্তর্বর্তী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন নুরি আসলান। তিনি ইমামোগলুর সিএইচপি দলের সদস্য। ইমামোগলুর মেয়াদের বাকি সময় দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। দুই দফা ভোটে ১৭৭ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত হন আসলান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী এরদোয়ানের এ কে পার্টির প্রার্থী জেইনেল আবিদিন ওকুল পান ১২৩ ভোট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত