দূরত্ব আর কম গভীরতার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি থেকে বেঁচে গেল বাংলাদেশ। গতকাল দুপুর ১২টা ২১ মিনিট ৩ সেকেন্ডে মিয়ানমারের ইরাবতী নদীর তীরে মান্দালয়ে যে স্থানে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছে, তা ঢাকার আগারগাঁও থেকে এর দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ৭ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের (বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঘোষণায় ৭ দশমিক ৩) ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। যদি মাটির আরও গভীরে এ ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতো, তাহলে দুর্যোগের সমীকরণ ভিন্ন হতো। শুধু দূরত্ব ও গভীরতার কারণে বেঁচে গেছে বাংলাদেশ।
গত কিছুদিন ধরেই ওই এলাকায় মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছিল। এখন ৭ দশমিক ৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে হয়তো আগামীর জন্যও বেঁচে গেল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। এ ভূমিকম্পের কারণে আরও ১৫০ বছর হয়তো এই এলাকায় আর কোনো ভূমিকম্পের দেখা পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ১৬৩ বছর আগে ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল রাখাইন এলাকায় ৮ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের একটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের পর ১৯৩২ সালের ১৪ আগস্ট মিয়ানমারের মান্দালয়ে ‘সাগাইং ফল্টে’ ৭ রিখটার স্কেল, ১৯৪৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর একই স্থানে গতকাল ৭ দশমিক ৯ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্প হলো।
এদিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা বলেন, শুক্রবার দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের মান্দালয়। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৩, যা মেজর ক্যাটাগরির ভূমিকম্প।
কম গভীরতায় রক্ষা : ১৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মিয়ানমারের সাগাইং ফল্টটি উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বিস্তৃত। এই এলাকায় গত জানুয়ারি থেকেই মৃদু ও মাঝারি মাত্রার অসংখ্য ভূমিকম্প হয়ে আসছে। আর এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হতো। কিন্তু গতকালের ভূকম্পনে পাশের দেশ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ৩০ তলার একটি ভবন মাটিতে মিশে যায়। সেখানে ব্যাপক ক্ষতি হলেও ৫৯৭ কিলোমিটার পশ্চিমের ঢাকা কিংবা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমের চট্টগ্রামে তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। এর কারণ কী? দেশের বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আনসারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দূরত্বের পাশাপাশি কম গভীরতায় ভূমিকম্পটি উৎপত্তি লাভ করায় আমাদের ক্ষতি কম হয়েছে। যদি মাটির আরও গভীরে উৎপত্তি হতো তাহলে ক্ষতি বেশি হতো। আর জনঘনত্ব ও বহুতল ভবন বেশি বলে ঢাকা-চট্টগ্রামে ভূমিকম্প দুর্যোগে ভয় বেশি।’
কিন্তু থাইল্যান্ডের ব্যাংককের দূরত্ব ঢাকা থেকেও বেশি। সেখানে বহুতল ভবন ধসে গেল কেন? এ প্রশ্নের জবাবে ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ‘থাইল্যান্ডের ব্যাংককের মাটি নরম, বিপরীতে চট্টগ্রামের মাটি শক্ত। এতে চট্টগ্রামে কম্পন অনুভূত হলেও তেমন ক্ষতি হয়নি। একই চিত্র ঢাকার ক্ষেত্রেও।’
ব্যাংককে নির্মাণাধীন ৩০ তলা ভবনে ধস ও আমাদের দেশে তেমন ক্ষতি না হওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বড় ভূমিকম্পে কাছের কম উচ্চতার এবং বেশি দূরত্বের বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গতকালের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও এ সূত্রটি আবারও প্রমাণিত হলো। এর আগে মেক্সিকো ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংককের মাটির কাঠামো নরম হওয়ায় সেখানের বেশি উচ্চতার ভবনগুলো দোলন নিতে পারেনি। তবে যে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটি যদি নির্মাণ শেষ হতো তাহলে এর স্ট্রেন্থ বাড়ত, তখন হয়তো তা ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। অন্যদিকে মিয়ানমারে কিন্তু কম উচ্চতার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
বড় ভূমিকম্প থেকে রক্ষার লক্ষণ : ২০০৪ সালের ২৬ নভেম্বর ভারত মহাসাগরে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার সুন্ডা খাতে ৯ দশমিক ৩ রিখটার স্কেলের শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের পর ভারত মহাসাগরে সুনামিতে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ আফ্রিকার উপকূলেও মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৪ সালের সেই ভূমিকম্পের পর আন্দামান সাগর পর্যন্ত কিন্তু মাঝারি বা বড় আকারের ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে না।
এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও দীর্ঘদিন ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করা মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত পাঁচ বছর আগে আমার একটি গবেষণা রিপোর্টে প্রকাশিত নিবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম সাগাইং ফল্টে হবে আগামীর শক্তিশালী ভূমিকম্প। ২০০৪ সালের সুন্ডা খাতের ভূমিকম্পে আন্দামান সাগর পর্যন্ত ভূ-অভ্যন্তরের শক্তি বের হয়েছিল। তখন এরই ধারাবাহিক হিসেবে সাগাইং ফল্টে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অবশ্যম্ভাবী ছিল। গতকালের এ ভূমিকম্পের কারণে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই এলাকায় আর বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা নেই।’
একই মন্তব্য করেন ড. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের পাশ দিয়ে যাওয়া প্লেট বাউন্ডারি ও সাগাইং ফল্টের অংশে আগামীতে আর বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা নেই। মাটির নিচে শক্তি বের হয়ে এসেছে এবং নিয়মিত মৃদু মাঝারি ভূমিকম্পে সেসব শক্তি বের হয়ে আসছে। ফলে সুন্ডা খাতের পর যেমন ইন্দোনেশিয়ায় বড় ভূমিকম্প হয়নি, এখানেও আর না হতে পারে।’
ভূমিকম্পে এখন ভয় কোথায়?: এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জিল্লুর রহমান বলেন, “আমাদের দেশের উত্তরে মণিপুরে ‘মাও চাঁদপুর’ নামে একটি ফল্ট রয়েছে। এ ছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রামের নিচে ‘কাবাও ফল্ট’ নামে আরেকটি ফল্ট রয়েছে। এ দুই ফল্টের পাশাপাশি রয়েছে ‘সাগাইং ফল্ট’। মূলত এ তিনটি ফল্টের কারণে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে নিয়মিত শক্তি বের হচ্ছে। তাই এখন উত্তরে ভূমিকম্প হতে পারে।’
একই মন্তব্য করেন বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আনসারী। তিনি বলেন, কোনো একটি এলাকায় ১৫০ বছর পরপর বড় ভূমিকম্প হয়ে থাকে। গতকালের ভূমিকম্পটি ১৫০ বছরের বৃত্ত পূরণ করেছে। তবে দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তেও ভূমিকম্প হতে পারে।
দেশের বাইরে উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম এলাকায়ও ভূমিকম্প হতে পারে উল্লেখ করে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গতকালের ভূমিকম্পের কারণে হয়তো আমরা দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত থেকে কিছুটা নিরাপদ হলাম। কিন্তু উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব প্রান্তের এলাকায় কিন্তু ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে, সেখানেও একটি বড় ভূমিকম্প উৎপত্তি হতে পারে।’
সারা বিশ্বে প্রতি বছর দুই হাজারবার ভূমিকম্প হয়। এর মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই টেকনাফ থেকে হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত গঠিত হয়েছিল হিমালয় পর্বতমালা।
