দর্শক 

মূল: আন্দ্রেস কাইসেদো  অনুবাদ: মিম আরাফাত মানব

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:২৮ এএম

রিকার্দো গঞ্জালেজ সিনেমা দেখতে যাইতো। এই সংক্রান্ত তার প্রথম স্মৃতি ছিলো এক শাদা কালো, চোর পুলিশের সিনেমা, যা সে দেখেছিলো বহুদিন আগে। এর আগে রিকার্দো গঞ্জালেজ মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে গেছে, হয়তো পনেরো দিনে একবার, বা তারও কিছু কম, মাসে একদিন, কিন্তু এই একটা সিনেমার পর সব বদলে গেলো। হল থেকে বের হয়ে তার মনে হইলো, এই ফিল্মটা আরেকবার দেখা খুব প্রয়োজন। আর সে দেখলোও। আবার সে নিজেরে হাজির করলো সেই একই শাদা আর কালো দৃশ্যের সামনে, আবারও চোরের দল তাদের চৌর্যবৃত্তি চালায়ে গেলো, আবারও তারা পুলিশের কাছ থেকে পালায়ে গেলো। আবারও তারা একটা ব্যাংকের টাকা ট্রান্সফারের গাড়ি চুরি করলো, কিন্তু কোনোবারেই তারা সেইটার তালা খুলতে পারলো না। রিকার্দো গঞ্জালেজ জানতো, এই গল্পের জট কীভাবে খুলবে, সেই কথা সে ব্যতিরেকে আর কোনো দ্বিতীয় দর্শক জানে না, তার মনে বারবার একটাই ইচ্ছা জাগে, সে কি তার আশপাশের কাউরে বলে দিতে পারে কি না এই গল্পের পরিণতি, তার পাশের সিটের মানুষের সাথে আলাপ করা যায় কি না সেই অদ্ভুত শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের ব্যাপারে, যখন একজন চোর এক পুলিশের হাত থেকে বন্দুক ছিনায়ে নিতে যাবে, জানবে না পুলিশটি তখনো জীবিত। কিন্তু  চারপাশে রিকার্দো গঞ্জালেজের পরিচিত কেউ ছিলো না, সবাই ছিলো আজনবি, অচেনা। গল্পের শেষে গিয়ে ধরা খায় সবগুলো পুরুষ চরিত্র ও গল্পের নায়িকা, চোরদের সর্দারের সাথে নায়িকা পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেয়। পর্দায় ভেসে ওঠে ‘সমাপ্ত’ শব্দটা, আর রিকার্দো মানুষের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারে যে তাদের এই সিনেমা ভালো লাগে নাই। সিনেমা ঝুইলা গেছে, তারা বলে, শেষে কী হইলো বুঝবারই পারলাম না। রিকার্দো সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটে শহরের এই মাথা ওই মাথা, দর্শকদের আচরণ সে ধরতে পারে না। সিনেমাটা কি এতই খারাপ, নিজেরে জিজ্ঞেস করে সে, নাকি তার ভুল হইতেছে কোথাও? শেষটা নিয়া মানুষের এত আপত্তি কীসের, সবই তো ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ছিলো! নায়ক নায়িকা শেষ সীনে আত্মহত্যা করে, এইটা না বোঝার কী আছে? কী বোঝে নাই মানুষ? মানে, হ্যাঁ, সে সিনেমার কিছুই বোঝে না, তারও ভুল হইতে পারে, এই কারণেই তার মাথায় এতগুলো প্রশ্ন ছিলো তখন। কারো সাথে যদি কথা বলা যাইতো, কাউরে যদি সে চিনতো এই শহরে, এই সিনেমা নিয়ে আলাপ করার মতন, কিন্তু কেউ নাই। সবচেয়ে ভালো সে যেইটা ভেবে বের করলো, সেটা হইলো পরের দিন আবার হলে যাওয়া।

দরজা দিয়া ঢোকার সময় তাকে দেইখাই দারোয়ানের হাসি, চিনতে পাইরা, ‘অন্তত একজনের এই জঘন্য সিনেমা ভালো লাগছে,’ রিকার্দোর পেছনে সে কারে যেন কয়, ‘এই লোক এই নিয়া আটবার এই সিনেমা দেখছে।’

রিকার্দো গঞ্জালেজ গিয়ে বসলো বরাবরের একই সিটে, আগের বারের মতোই। আলো নেভার অপেক্ষায় সে বসে থাকলো, কিছুটা নার্ভাস লাগতেছিলো তার। এবার সে জানতো, নায়কের চরিত্রে যেই অভিনেতা, তার নাম রড স্টাইগার, আর নায়িকার চরিত্রে নাদিয়া টিলার। ঠাণ্ডা ঘামে ভেজা জর্জরিত অবস্থায় সে গল্প ফলো করে গেলো। আর শেষ দৃশ্যে, যখন স্টাইগার আর নায়িকা পাহাড়ের ওপর থেকে পুলিশরে বলে, ‘হ্যাঁ, গেলাম আমরা’, রিকার্দো আবারও টের পাইলো যে এইবারও দর্শকেরা কিছু না বুঝেই চলে যাবে হল থেকে।

‘ওরা আত্মহত্যা করতেছে, পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতেছে’, হঠাৎ চিৎকার দিলো রিকার্দো, সিটের ওপর উঠে গেলো লাফ দিয়া, হাত দুইটারে গোল করে সামনে আনলো, মাইকের মতন...

আর পাহাড়ধসের মতন নাইমা আসলো অসংখ্য আকুতি, চুপ কর হারামজাদা, কিন্তু রিকার্দো সেই আকুতিরে কোনো পাত্তাই দিলো না।

‘দেখেন আপনেরা, ক্যামেরা নিচের থেকে ধরা, ওরা দরকার হইলে মইরা যাবে, তাও পুলিশের কাছে ধরা দিবে না!’ আবার চিৎকার রিকার্দোর, আর ঠিক তখনই শার্টের কলার ধইরা ওরে বের করে দিলো হলের তিনজন কর্মচারী।

‘এই ফালতু সিনেমার একমাত্র ভালো দিক হইলো হলের মাঝখানে ওই বেডার চিৎকার’, এক বেগুনি পোশাকের মহিলাকে একটু পরেই হল থেকে বের হওয়ার সময় বলতে শোনা যায়।

সিনেমা দেখার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার ভালো একটা ছবি দেখার পর আপনি যখন বের হইতে থাকা মানুষের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি কইরা নেবেন, বা একটা বাজে ছবি দেখার পর সবার সাথে চিৎকার কইরা বলবেন, আমার টাকা ফেরত দে। শনিবারের মজাই এইটা, আমি দেখি জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক প্রেমিকা হাতে হাত ধইরা হলে আসে, আর আমি তাদেরকে ভালো বাইসা ফেলি, কারণ আমি জানি, তাদের কাছে এইটুকুই সব। শনিবার সবাই খুশি, আর সবাই কথা কয় অনেক, তাই আমিও শুনি, তারা কী কয়, আমি বিভিন্ন গ্রুপের আশপাশে থাকি, তাদের সিনেমা সংক্রান্ত কথাবার্তা শুনলে বুঝি, তাদেরও আমার মতন একই জিনিস ভালো লাগছে, একই চিন্তা তাদের। রবিবারগুলোও খুব ভালো, কিন্তু আরেক রকম রবিবার লোকে সিনেমা দেখে যায়, কিন্তু চেহারা থাকে বিমর্ষ; পরের দিনটাই যে সোমবার, তা তাদের চোখেমুখে অতিরিক্ত স্পষ্ট হয়া যায় মনে হয়। এই কারণে, রবিবারে বোঝার উপায় থাকে না তাদের সিনেমা কেমন লাগছে।

কিন্তু আমার যদি একটা বান্ধবী থাকতো, যার সিনেমা ভালো লাগে, জিনিসপত্র অনেক সহজ হয়ে যাইতো। হ্যাঁ, তাইলে হল খালি নাকি নাই তোয়াক্কা না কইরা প্রতিদিন একসাথে সিনেমা দেখতে যাওয়া যাইতো, শহরে হাঁটতে হাঁটতে সিনেমা নিয়ে আলাপ করা যাইতো। আমার জন্য তো খুবই ভালো হইতো, বিশেষ কইরা সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয়, যখন আর কেউ সিনেমা দেখতে যায়ই না বলতে গেলে। আশেপাশে কেউ নাই, একা বসে আছি, এটা খুব দুঃখের, কিন্তু আমি সিনেমা দেখতে না গেলে, আমি শেষমেষ করবোটা কী? এ রকম অনেকবার হইছে যেকোনো এক সোমবার আমি ভাবছি হল থেকে বের হয়ে যাবো, যখন আমার আশপাশে মানুষ বলতে ছিলো তিন-চারজন তিতা মুখের মানুষজন। কিন্তু আমি সম্ভবত সামনে কোনো একদিন শহরের ভেতরে কাউরে খুঁজে বের করবো, যার সিনেমা ভালো লাগে, যাদের সাথে আমার প্রতি শনিবারেই কোনো কোনো না কোনো হলে দেখা হয়। একটা সোনালি চুলের মেয়ে আছে যেমন যে প্রতিবার হাসিমুখে সিনেমা দেখতে আসে তার প্রেমিকের সাথে। সিনেমা নিয়ে সে সম্ভবত অনেক কিছু জানে, তারে আমি সপ্তাহে প্রায়ই দু-তিনবার দেখি। কাউরে খুঁজে বের করা, আর তারে সব কিছু বলা, প্রথম সিনেমা থেকে শেষ সিনেমা পর্যন্ত। কসম, আমি একদিন এ রকম কাউরে খুঁজে বের করবো।

ইউ আর এ বিগ বয় নাউ সিনেমাটা হলে তিন দিনের বেশি চলে নাই। রিকার্দো গঞ্জালেজ সিনেমাটা এই তিনবারের মধ্যে এক শুক্রবার দেখে, আর শনিবার সে আবার একই সিনেমা দেখতে যায়। এই শনিবারেই দর্শকেরা খেপে গিয়ে সিনেমা শুরু হওয়ার আধা ঘণ্টার ভেতর তাদের টাকা ফেরত চাইতে থাকে। আর কেউ সেই দাবির দিকে ভ্রুক্ষেপ না করলে তারা চিপসের প্যাকেট থেকে শুরু করে জুতা পর্যন্ত ছুড়তে শুরু করে, যেই জুতা পর্দা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে হলের লাইট জ্বালানো হয় এবং তাদের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়, এমন করলে এরপর আপনাদের কর্র্তৃপক্ষ হল থেকে বের করে দেবে। বাতি নেভানোর পর অবশ্য জনগণ একই আচরণ চালায়ে যায় এবং কর্র্তৃপক্ষ কাউকেই বের করে না। রিকার্দো, রাগে কাঁপতে কাঁপতে, ভাবতে থাকে, শো বন্ধ করে দিতেছে না কেনো, আর সিনেমা এত অপছন্দ হইলে মানুষ চলে যাচ্ছে না কেনো? রিকার্দোর কাছে পুরা সিনেমার রানটাইম ছিলো যেনো শাহাদাতবরণের মতন, সে দেখে যাইতেছিলো সিনেমায় ডেবু করা নতুন নায়ক, সুন্দরী অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্টম্যান, আর ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার কাছে দুনিয়ার সব সিনেমাপ্রেমীর পক্ষ থেকে এই অশোভন আচরণের জন্য সে ব্যক্তি গতভাবে ক্ষমা চেয়ে যাইতেছিলো। সিনেমা শেষ হইলে রিকার্দো প্রতিবাদরত জনতার মাঝে নিজেকে সঁপে দেয়। সোনালি চুলের মেয়েটা ওইখানেই ছিলো। রিকার্দো তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, জানতে, কেমন লাগলো তার, কিন্তু সে কিছুই বলে না, শুধু প্রেমিকের দিকে তাকায় আর হাসে, স্রেফ এতটুকুই। রিকার্দো গঞ্জালেজ বিস্ময়ের সাথে ভাবে, ইউ আর এ বিগ বয় নাউ, ছেলে তুমি বড় হয়েছো এর মতন চমৎকার একটা ছবি দেখার পর কিছু না বলার মতন কাজ এত সুন্দরী একটা মেয়ে কীভাবে করে! সে যদি আমারে শব্দের ভেতর দিয়ে জানাইতো, কতটা ভালো লাগছে তার এই সিনেমা, আমি তার কাছে যাইতাম, তারে অভিনন্দন দিতাম, কিন্তু সে কিছু বলে না, শুধু যদি সে হাসির ভেতর দিয়ে বলতো,

‘এটা একটা সেরা সিনেমা, এ বছর আমার দেখা বেস্ট’, শব্দগুলা কে যেনো রিকার্দোর ঘাড়ের ওপরেই বললো অলমোস্ট। রিকার্দো গঞ্জালেজ তার চোখ বড় বড় করে আর মুখ শক্ত করে ডানে বামে দেখা শুরু করলো, কে বললো এই কথা একটা মোটা লোক, পরনে নীল জিন্স, যে সিনেমার কোয়ালিটি নিয়ে মানুষের মুখের ওপর ভারী ভারী কথা বলে যাচ্ছিলো, আর লোকে তাকে দেখতেছিলো যুদ্ধংদেহী বিদ্রুপের সাথে। রিকার্দোর অবশ্য তার এই জটিল সিচুয়েশন দেখে কোনো দুঃখবোধ হয় নাই। বরং তার মধ্যে তৈরি হইছে ভালো লাগা। সব কিছু ছুড়ে ফেলে দিয়ে তার ইচ্ছা হইছে ভোটকারে সেও জড়ায়ে ধরবে, আর চিৎকার কইরা জানাবে, আমারও তো কপোলার এই সিনেমা নিয়া একই অভিমত। কিন্তু তবুও সে নিজেরে থামায়ে রাখে, হল থেকে বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো। মানুষের ফাঁক গলে রিকার্দো লোকটারে সিনেমা হল থেকে বের হয়ে একটা পোস্টারের সামনে দাঁড়াইতে দেখে, আর সেও দেখাদেখি তাই করে, শিওর হয় যে লোকটা একা। সম্ভবত সেও কাউরে খুঁজতেছে, সিনেমা নিয়া কথা বলার জন্য, ভাবে রিকার্দো, আর এদিকে ভোটকা রাস্তা ধরে হেঁটে চলে যায়। আলাপচারিতা শুরু করার এমন চমৎকার একটা সুযোগ হাত ফসকায়ে যাচ্ছে, এই কথা স্বীকার মেনে রিকার্দো গঞ্জালেজ ভোটকার পিছে পিছে হাঁটতে থাকে, ভাবতে থাকে আলাপ শুরু করা যায় কী দিয়ে। দেখুন না দাদা, সিনেমাটা তো আপনি দারুণ বোঝেন, এটা তো জলের মতন পরিষ্কার। এভাবেই কথা বলে এই শহরের মানুষেরা। আর যখন ভোটকা জিজ্ঞেস করবে, ইউ আর এ বিগ বউ নাউ সিনেমাটাই কেনো, ইশ, এই শহরের লোকে যদি সিনেমার কদর করতে জানতো রে ভাই। তারপর তারা বসে থাকবে কোনো এক কুলিং কর্নারে, আর নাইলে পকেটে হাত দিয়ে সেরা সব সিনেমার কথা বলতে বলতে, ফেলিনির জুলিয়েট অব দ্য স্পিরিটস, বা ক্যারল রিডের যেই সিনেমাটার নাম স্প্যানিশ ডাবিঙে ছিলো প্রোফুগো দে সু পাসাদো, চিনেন নাকি সিনেমাটা? একজন ইংরেজ অভিনেতা ছিলো মনে হয় সিনেমাটায়, বেশ বয়স্ক ভদ্রলোক, প্রোফুগো দে সু পাসাদো, অতীত থেকে পলাতক, সিনেমাটায় ছিলেন লরেন্স হার্ভে, এলান বাতেস, নামটার উচ্চারণ কি বেইটস? আর লী রেমিক, ঝকঝকে দাঁতের সুন্দরী মহিলা। সিনেমাটার ইংরেজি নাম ছিলো রানিং ম্যান, বালাড অব দ্য রানিং ম্যান, ছুটন্ত মানুষের গান, কবিতার মতন নাম, না কি বলেন? এই সিনেমাটার কথা বলি কারণ এসব সাসপেন্স থ্রিলার সিনেমাগুলো কেমন সুন্দর যেনো হয়। তারা আরো বলবে রবার্ট ওয়াইজের কথা, তার সেসব সিনেমার কথা যেগুলো তিনি বানাইছিলেন, শুধুই অস্কারের জন্য তিনি সিনেমা বানানো শুরু করার আগে। তারা কথা বলবে লা মানসিওন দে লস এস্পেকত্রোস , আত্মাদের প্রাসাদ, হিল হাউজ বা হন্টেড সিনেমাটা, জানি না কোনটা, আমার সব সময় প্যাঁচ লাগে সিনেমার আসল নাম আর স্প্যানিশ ডাবিংয়ের নাম আর যেই উপন্যাস থেকে সিনেমাটা বানানো, তার নামের মাঝে, এখন আর জানি না কোনটা যে কীসের নাম। হিল হাউজ, জুলি হ্যারিসের একটা ভূতের ছবি, ঠিক এভাবেই তো একটা ভূতের গল্প বলতে হয়, আমি বলি, ঠিক এতটা সম্মানের সাথে, এতটা যতেœর সাথে। আরো বলবে সে, আমি তো জন্ম থেকেই সিনেমা দেখতে আসি, কিন্তু কখনো কারো সাথে আলাপ করা হয় নাই, এই প্রথম সুযোগ হইলো আইডিয়া এক্সচেঞ্জ করার। তাহলে, আর দুই ব্লক হাঁটার পর সে ভোটকাকে ধরে ফেলবে। আমারও ভালো লাগছে, ইউ আর এ বিগ বয় নাউ, বড় ভাই ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলারে সবাই সালাম জানাও।

ভোটকা পকেট থেকে তার হাত বের করলো, আর থামায়ে দিলো হাঁটা। রিকার্দো গঞ্জালেজ ঠিক ছয় কদম পরে ঠিক একই কাজ করলো। ভোটকা ঘাড় ঘুরায়ে দেখলো পেছনে, যেনো কিছু একটা পড়ে গেছে, সে খুঁজতেছে সেটা। আরো পেছন দিকে চোখ ফিরাইতেই তার চোখ গিয়ে পড়লো রিকার্দোর ওপর। রিকার্দো হাসতেছে তার দিকে তাকায়ে, কারণ হাসি ছাড়া আর কী করবে সে ভেবে পায় নাই, সে ভাবতেছে ভোটকা ফিরে আসবে, তার দিকে হাত বাড়ায়ে দেবে। আপনি কি সিনেমা দেইখা আসলেন, নাকি ভাই? আর যখন সে দেখলো, ভোটকা ফিরতেছে না, রিকার্দো ভাবলো যে সে হয়তো অপেক্ষা করতেছে, রিকার্দো গিয়ে কথা বলবে তার সাথে। কিন্তু না, তাও না। ভোটকা আবার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকায়, আবার হাঁটা শুরু করে, আগের চেয়ে দ্রুত। কিঞ্চিৎ চাপ খেয়ে গেলো কি না রিকার্দো, রিকার্দোও পিছু নেয়, বরাবর। অন্ধকার হয়ে আসতেছে, অনেকক্ষণ ধরে তারা হেঁটে আসতেছে। রিকার্দো ভাবলো, পা আরো দ্রুত চালাইতে চালাইতে, সামনের মোড়েই সে ভোটকাকে ধরে ফেলবে। আপনি সিনেমা সম্পর্কে ভালোই জানেন, ইউ আর এ বিগ বয় নাউ কি আপনার ভালো লাগছে? ভোটকা মোড়ে পৌঁছে গেছে, আবার সে ঘাড় ঘুরায়ে পেছন দিকে দেখতেছে, আর আবার হাসে রিকার্দো, আবার সে ভাবে ভোটকা এবার নিশ্চয়ই থামবে। কিন্তু সে থামে না, সে রাস্তা ক্রস করে ডান দিকে চলে যায়। রিকার্দো কী হইলো বুঝতে না পেরে নিজেও মোড়ের দিকে দৌড়ায় আর ডানদিকে ক্রস করতে যায়, কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখে, ভোটকা উধাও হয়ে গেছে। রিকার্দো গঞ্জালেজ চোখ সরু করে, বুঝতে চেষ্টা করে, ওই দূরে যে মানুষটা হেঁটে যাচ্ছে, অন্ধকার গলিতে, সন্ধ্যা সাতটার নিভু আলোয়, সেই কি তার খুঁজে চলা সেই ভোটকা? সে তো না। চিন্তা করতে করতে সে নিজেরেই জিজ্ঞেস করে, কী হইলো বন্ধু মানুষটার? গেলেন কই মিয়া, আপনার সাথে ইউ আর এ বিগ বয় নাউ বিষয়ে কথা ছিলো, কী সেরা একটা সিনেমা, না?

আর তখন তারে আবার দেখা গেলো। একটা হলুদ রঙের বিল্ডিংয়ের গেট খুলে গেলো, আর বের হয়ে আসলো বন্ধুর বিশালাকায় দেহটি। আবারও তার নীল জিন্সের পকেটে হাত, এবার সে শক্ত করে তাকায়ে আছে রিকার্দোর দিকে, যে কি না আবার হাসতেছে, আর আলাপ শুরু করতে যাচ্ছে অলমোস্ট, আর তখনই সে দেখলো আরো লোক আছে এখানে।

‘হ্যালো ভাই’, বললো রিকার্দো। শুরুটাই কি বিচ্ছিরি হইছে। এই শহরে মানুষ আলাপ শুরু করে সালাম দিয়ে, বা জিজ্ঞেস করে, কী খবর।

ভোটকা কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু ড্যাবড্যাব করে তাকায়ে থাকে। তার পেছনে এসে দাঁড়ায় আরো চারজন যুবক, পাঁচ নাম্বার একজন বাড়িটার গেট বন্ধ করে। সিনেমাটা আপনার ভালোই লাগছে, নাকি ভাই? তোতলায় রিকার্দো, কাছে আসতে আসতে।

‘গায়ে হাত দিবি না, শালা গে’ ভোটকা একটু থেমে গিয়ে বলে, ‘কাছেও ঘেঁষবি না’। হাস্যকর রকমের শুকনা, কিন্তু ভোটকার একই চেহারার একজন বলে, ‘হালার খোমাটা ভাইঙা দেই’।

‘জি?’, রিকার্দো গঞ্জালেজ জবাব দেয়, ‘আমি তো শুধু’, ভোটকাকে দেখায় সে, ‘আমি তো উনার সাথে কথা বলতে আসছিলাম, সিনেমাটা নিয়ে, উনারে জিজ্ঞেস করেন, ভাই, আপনি ইউ আর এ বিগ বয় নাউ দেখে আসলেন না মাত্র?’

‘কী হইছে তোর? হলে তোর সখীদের কাউরে পাস নাই, মাঙ্গের পুত?’ রিকার্দোর বাড়ানো হাত এক ধাক্কায় সরায়ে দেয় সে।

‘না, না, আপনি বুঝতেছেন না, আপনাকে বুঝাইতে পারতেছি না, আমি আসছিলাম যাতে আমরা সিনেমাটা নিয়া একটু আলাপ করতে পারি, আপনার সিনেমাটা ভালো লাগছে, তাই না?’

‘না, লাগে নাই’।

অতঃপর মাইর খায় রিকার্দো গঞ্জালেজ। ভোটকার উত্তর হজম করার আগেই সে টের পাইলো যে কে যেনো আঘাত করছে ওর মাথার পেছনে। একটা আঘাত ওইখানে, ভোটকার তরফ থেকে একটা ঘুষি, ভোটকার মুখ ঘুষির পেছনে, কী যেনো পিঠে গিয়ে লাগলো, এই ছেলেগুলো কী যে খুশি, পিটাইতে পাইরা, আর একবার যদি একই জায়গায় মারে, আমি টিকতে পারবো না, রক্ত বের হবে না আল্লাহ, কিন্তু টিকতে তো পারবো না, লোকটা বললো সিনেমাটা তার ভালো লাগে নাই, কিন্তু সে তো এই লোকটা ছিলো না, আমি তো আসছিলাম সিনেমা নিয়ে কথা বলতে, কোনো এক মা ডাকতেছে, খোকা, তোরা খেয়ে যা, আম খুলতেছে ডালে, এরকম তো হয় না এখানে, এই শহরের সবাই তো সবাইকে ভালোবাসে, আর এরপর তার শরীর ধপাস করে আছাড় খায় শক্ত কিছুর ওপর, মিষ্টি কংক্রিটের ওপর, অল্পক্ষণেই ভিজে ওঠা কংক্রিটের ওপর।

এত এত দিন ধরে আমি সিনেমা দেখতে যাই যে পর্দার মানুষগুলোর গায়ের গন্ধ পর্যন্ত আমার চেনা হয়ে গেছে। এই তো সেইদিন পিটার কলিনসনের একটা নতুন সিনেমা দেখলাম, লং ডেজ ডাইং, সারা দিন ধরে মৃত্যু, একটা অনন্ত দিন যেখানে তারা সারা দিন শুধু মারে আর মারে, কারণ যখন তারা মরেও, তারা মরে তো বটেই, তারা যখন মরে, তখনও তারা কাউরে না কাউরে মারে। কিন্তু অনেকগুলো শনিবার আর অনেকগুলো রবিবার চলে গেছে, অনেকগুলো সিনেমা পার হয়ে গেছে। আমার তাই সন্দেহ হয় যে আমার মতন সুখী লোক এই শহরে আর দ্বিতীয়টা থাকে না, যখন আমি বুঝি যে আমার সাথে যারা সিনেমা দেখতে গেছেন তারাও সিনেমাটার বিষয়ে আমার মতোই একই ধারণা নিয়া ঘোরেন। এ রকম কোনো এক দিনে আমি আমার এই বন্ধুদের সালাম জানাবো, আমার পাশে বসা সব সুন্দরীকে অভিবাদন জানাবো, কিন্তু একবার হেলো বলা শুরু করলে তা আর কোনো দিন শেষ হবে না। সোনালি চুলের সেই মেয়েটা আর ফিরেই আসে নাই, শহর ছেড়ে চলে গেছে হয়তো, কিন্তু তার সাথে যে ছেলেটা ছিলো সে ঠিকই আসছে, আসছে অন্য কোনো মেয়ের সাথে, নীল চোখ কালো চুলের কারো সাথে। এরাও তো আমার বন্ধু, আমাকে দেখলেই তারা জোর গলায় হেলো বলে। কত শনিবার কত সিনেমার পর্দায় কত কিছু ঘটে গেছে, এত ভালো লাগে যখন পিটার ওয়াটকিন্স আর জিল্লো পন্তেকোর্ভোর সিনেমা ছাড়ে, আর যখন গল্পটা হয় স্টুয়ার্ট রোসেনবার্গের, আপনারা কি পল নিউম্যানরে নিয়া উনি যে ছবিটা করলো, লেয়েন্দা দে ইন্দোমাবলে, অপরাজিতের গল্প দেখছেন নাকী ছবিটা? কুল হ্যান্ড লুকাস, হ্যাঁ, কিন্তু আপনাদের তো কোনো আপত্তি করার কিছু নাই যে আমাকে অরিজিনাল সিনেমার নামটা বলাই লাগবে যখন স্প্যানিশে ডাব করতে গিয়া ওরা নামটারে পুরা ভজঘট করে দিছে, আপনারা তো জানেনই। এ জন্যই মনে করেন আমি শনিবারের অপেক্ষায় থাকি, বন্ধুদের সাথে দেখা হবে, আলাপ হবে, শহরের এই মাথা ওই মাথা চইষা বেড়াবো আমরা, আমাদের মাথার ভেতরে রহাকবে রবার্ট আলড্রিচের লিজেন্ড অব লায়লা ক্লেয়ার সিনেমায় সেই কিম নোভাক, আমরা টের পাবো যে আমরা লী রেমিক আর শার্লি ম্যাকলেইন আর আনজানেট কোমারের প্রেমে পাগল হয়ে গেছি, আনজানেট যেবার মারলন ব্রান্ডোর সাথে এক সিনেমায় মেক্সিকান একটা রোলে ছিলো, আর আমরা তো প্রেমে পড়ছিলাম রিপালশন সিনেমার ক্যাথারিন দনুভেরও। আর আমাদের তো মাঝে মাঝে আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া এলিজাবেথ টেইলর আর রিচার্ড বার্টনের সিনেমার কথাও মনে পড়ে, পড়ে না? আমরা তাদের যেই এক্সিডেন্টে মৃত্যু হবে, সেই এক্সিডেন্টের ব্যাপারে আমরা গল্প বানাই, আমরা হাসি তাদেরকে নিয়া, কিন্তু ভালোও তো বাসি। আর সপ্তাহ শেষ হইলে, বরাবরের মতন, আমরা শস্তার সিনেমা হলে যাই, কী কী সিনেমা মিস হয়ে গেলো সেগুলো দেখতে, যেমন কিছুদিন আগে আমরা দেখলাম আর্থার পেনের হাউরিয়া উমানা, মানুষের খাঁক, ইংরেজি নাম বোধহয় চেইজ, আমি হল থেকে বের হইলাম আমার প্রেমিকার হাত ধরে, আমার মনে পড়তেছিলো ব্লো-আপ সিনেমার শেষ দৃশ্য, তুমি তো জানোই বাবু, একটা লোক যে শহরের মাঝখানে উ™£ান্তের মতন ঘুরে বেড়ায় আর এরপর দেখে যে দুজন প্রেম করতেছে, ছবি তোলার জন্য পারফেক্ট, সে দাঁড়ায়ে আছে ভালোবাসার সামনে, ফটোগ্রাফার হয়ে, আর এরপর সেই ভালোবাসার ছবিতে দেখা গেলো আছে অপরাধ আর মৃত্যু, আর লোকটাও এই ছবি হাতছাড়া করতে চায় না কারণ তার এই কুৎসিত জীবনে এত বড় কোনো ঘটনা এর আগে কখনো ঘটে নাই, কিন্তু  পারবে না বাবু, তোমাকে বলি, শোনো, এভাবে বেঁচে থাকা যায় না, সেসব সুখী মানুষের একজন হওয়া বরং ভালো যাদের সৌভাগ্য যে তাদের চিন্তা করতে হয় না, টিকে থাকতে হইলে তোমাকে ব্যাডমিন্টন খেলতে পারতে হবে কর্ক ছাড়া, র‌্যাকেট ছাড়া। এভাবেই, শহরটা টিকে আছে, আমি শহরে টিকে আছি, আমি সিনেমা দেখি, আমি একজন সুখী মানুষ।

রিকার্দো গঞ্জালেজের সবচেয়ে ভালো লাগতো ওই সিনেমাটা নিয়ে কথা বলতে পারলে, যা সে বহু আগে দেখেছিলো, একটা কাউবয় সিনেমা, নাম জার্নি টু শিলোহ, যার যুদ্ধের সিনগুলো অন্য বিভিন্ন সিনেমা থেকে কাটপিস করা। আমেরিকার সিভিল ওয়ার নিয়ে এটাই একমাত্র সিনেমা যেখানে তরুণ অভিনেতাদের দেখা যায়, টেক্সাসের সাতটা তরুণ কাউবয় কী যেনো খুঁজে বেড়ায়, তারা জানে না তারা কী খোঁজে। তার খুব ভালো লাগতো এই সিনেমার কিছু সিন কত সুন্দর, এটা যদি সে কাউরে বুঝাইতে পারতো, কিন্তু সে চুপ থেকে যায়, সে জানে, তাকে চুপ থাকতে হবে, আর যখন সে সিনেমা হল থেকে বের হয়ে শহরের পথ ধরে হাঁটা দেয়, নিচের দিকে তাকায়ে, নিজের সাথে কথা বলতে বলতে, সে তখন স্মৃতি থেকে শহরের প্রতিটা ফুটপাত চেনে, আর পর্দায় দেখা প্রতিটা রঙ আর প্রতিটা চুম্বন আর প্রতিটা শব্দ সে মনে করতে পারে। কারণ, রিকার্দো গঞ্জালেজ এখনো সিনেমা দেখতে যায়। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত