ইউনূস-মোদি বৈঠক হতে পারে ব্যাংককে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:৪৮ এএম

বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ বৃহস্পতিবার ব্যাংকক যাবেন। সফরে সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।

গতকাল বুধবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি-সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান বিমসটেক সম্মলনের ফাঁকে ইউনূস-মোদি বৈঠকের সম্ভাবনার কথা জানান। তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠকের একটা শিডিউল চাওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, বৈঠকটি হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট  সকাল ৯টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করবে।

ইউনূস-মোদি বৈঠকের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ প্রতিনিধি সম্ভাবনার কথা বললেও কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো বলছে, বৈঠকের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে সায় পাওয়া গেছে। সাইডলাইনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান আজ এই দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গতকাল ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে এই বৈঠক (দুই দেশের নেতাদের মধ্যে) আয়োজনের অনুরোধ করেছি... এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. খলিলুর বলেন, বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতারা সংস্থাটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করবেন, তাই অধ্যাপক ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এই বৈঠক নিয়ে আমাদের আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত। ভারতের সঙ্গে টানাপড়েনের অবসান চায় দুই দেশের মানুষই। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনূস-মোদির বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে গত মাসে এ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়ে দিল্লিতে চিঠি পাঠিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ওই চিঠির জবাব না পাওয়ার মধ্যে মোদির প্রকাশিত সফরসূচিতে ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কোনো বিষয় ছিল না। পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিন ২৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমরা যেকোনো দেশের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের যে বৈঠক, সেই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি এবং ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বর্তমান যে প্রেক্ষাপট, সেই প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটিকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’ এবং আমরা আশা করি যে, যদি এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে স্থবিরতা, সেটা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। গতকালও ব্যাংককে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিনও ইউনূস-মোদি বৈঠক নিয়ে প্রায় একই রকমের বক্তব্য দেন।

বৈঠকের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এই বৈঠকের জন্যে ভারতীয় পক্ষকে অ্যাপ্রোচ করেছি এবং আমরা একটা ইতিবাচক উত্তরের অপেক্ষায় আছি।’ ভারতীয় এক সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে একটা অনুরোধ জানানো হয়েছে। আমরা নিশ্চয়ই আশা করি, বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।’

এদিকে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে ড. খলিলুর রহমান জানান, বিমসটেক সম্মেলন ২০২৫ সাতটি প্রধান আঞ্চলিক সহযোগিতা স্তম্ভের ওপর গুরুত্ব দেবে। এগুলো হলো  বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা; জনগণের মধ্যে সংযোগ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং কানেক্টিভিটি। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ আরও জানান, অধ্যাপক ইউনূস সম্মেলনের সময় দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। আগামী ৪ এপ্রিল (শুক্রবার) অধ্যাপক ইউনূসকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।

খলিলুর রহমান বলেন, এবারের শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ দায়িত্ব নিয়ে ‘বাস্তবসম্মত উপায়ে’ আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক জোটগুলো বিভিন্ন দেশকে একত্রিত করে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালায়। আমাদের এই অঞ্চলে কানেক্টিভিটি একটা অত্যন্ত প্রধান বিষয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া সেটা করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, এটাও এই অঞ্চলের কোনো দেশ, বিশেষ করে ছোট ছোট দেশগুলোর এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, বিমসটেক সম্মেলন গত বুধবার থেকে শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের খসড়া ঘোষণা চূড়ান্ত

থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের খসড়া ঘোষণা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কাল শুক্রবার জোটটির শীর্ষ সম্মেলনে এটি গৃহীত হওয়ার কথা রয়েেেছ। গত মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিমসটেকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকের (এসওএম) ২৫তম অধিবেশনে এটি চূড়ান্ত করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে (এসওএম) অংশগ্রহণ করছে।

আসন্ন বৈঠকের প্রস্তুতি হিসেবে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০তম বিমসটেক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের খসড়া অস্থায়ী এজেন্ডা এবং খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা এবং চূড়ান্ত করেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের খসড়া অস্থায়ী এজেন্ডা এবং খসড়া ঘোষণাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্র সচিব ‘নীল অর্থনীতিসহ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন’ খাতের অগ্রগতি সম্পর্কে একটি বিবৃতি দেন। বিমসটেকে এই বিষয়গুলোর জন্য বাংলাদেশ দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বিমসটেকমুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সম্পর্কিত কাঠামো চুক্তির পণ্য বাণিজ্য, উৎপত্তির নিয়ম, শুল্ক বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা, বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া, বাণিজ্য সুবিধা, বিনিয়োগ এবং পরিষেবায় বাণিজ্য সম্পর্কিত ছয়টি উপাদান চুক্তির সময়োপযোগী চূড়ান্তকরণ নিশ্চিত করতে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান। কারণ, আমাদের অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এফটিএ বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা কানেক্টিভিটি চাপিয়ে দেব না, সেভেন সিস্টার্স প্রসঙ্গে হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ

সম্প্রতি চীন সফরে ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, কানেক্টিভিটি এই অঞ্চলের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। বিশেষ করে যাদের জন্য সমুদ্রে এক্সেস পাওয়া খুব কঠিন। আমরা কিন্তু কানেক্টিভিটি জোর করে চাপিয়ে দেব না, সেটা করার মতো অবস্থাও আমাদের নেই। কেউ যদি নেয় খুব ভালো, না নিলে কী করব আমরা, কিছু করার নেই। অত্যন্ত সৎউদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথাই প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। এর ব্যাখ্যা যদি অন্যরকম দেওয়া হয়, আমরা সেই ব্যাখ্যা ঠেকাতে পারছি না। আমরা শুধু সবার সমান লাভের জন্য কানেক্টিভিটি দিতে আগ্রহী আছি, কেউ নিলে ভালো, না নিলে নেবেন না।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা সেভেন সিস্টার্স নিয়ে এই প্রথমবার কথা বলেননি। তিনি ২০১২ সালে একই ধরনের কথা বলেছিলেন। এর চাইতে একটু এগিয়ে গিয়ে ২০২৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশ একটা ভ্যালু চেইনে আবদ্ধ করা এবং তিনি এ প্রসঙ্গে একটা একক অর্থনৈতিক অঞ্চলের কথাও বলেছিলেন, যেটাকে বিগ বে ইনেশিয়েটিভ বলে গণ্য করা হয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত