বাংলাদেশি পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলে ভারত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুরসহ কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর জন্য প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। একই সঙ্গে পণ্য রপ্তানির খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে চার দিনের বিনিয়োগ সম্মেলনের ওপর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বেজা ও বিডার গভর্নিং বডির সভায় এসব আলোচনা হয়েছে বলে তুলে ধরেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিডার বাণিজ্য উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রচি, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
আশিক চৌধুরী বলেন, আশুলিয়ায় উৎপাদন করে একটা টি-শার্ট ঢাকা বিন্দানবন্দর থেকে এয়ার কার্গোর মাধ্যমে পর্তুগালে নিয়ে গেলে যে খরচ হয়, গাজীপুর থেকে ট্রাকে করে দিল্লি নিয়ে সেখান থেকে পর্তুগাল পাঠালে তার চেয়ে খরচ কম পড়ে। এ জায়গায় কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুরের কার্গো হ্যান্ডেলিং সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কাজ কীভাবে দ্রুত শুরু করা যায় তারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলের সিদ্ধান্তকে আমরা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাই।’ এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে লালদিয়ার মতো একাধিক বন্দর রয়েছে। এগুলো মূলত নদীবন্দর। এজন্য আমরা বে টার্মিনালকে অক্টোবরের মধ্যে চালু করে বন্দরের যোগাযোগ এবং সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। একই সঙ্গে বন্দরে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল তৈরির আলোচনা চলছে। মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বেজার গভর্নিং বডির সভায় ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা নির্দিষ্ট কিছু মানদ- নির্ধারণ করছি, যেগুলো পূরণ না হলে আর নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেওয়া হবে না। একটি বা দুটি দপ্তরের ছাড়পত্রের কারণে যাতে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো অকার্যকর না হয়, সেজন্য সব দপ্তরকে একসঙ্গে কার্যকর করার বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, বাতিল করা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে পাঁচটি সরকারি ও পাঁচটি বেসরকারি। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক (কক্সবাজার), সুন্দরবন ট্যুরিজম পার্ক (বাগেরহাট), গজারিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (মুন্সীগঞ্জ), শ্রীপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল (গাজীপুর) ও ময়মনসিংহ অর্থনৈতিক অঞ্চল। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস শিল্প পার্ক, বিজিএমইএ (মুন্সীগঞ্জ), ছাতক ইকোনমিক জোন (সুনামগঞ্জ), ফমকম ইকোনমিক জোন (বাগেরহাট), সিটি স্পেশাল ইকোনমিক জোন (ঢাকা) ও সোনারগাঁ অর্থনৈতিক অঞ্চল (নারায়ণগঞ্জ)। জানা গেছে, সব মিলে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে। এ তালিকা যাচাই-বাছাই করে আরও কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এর বাইরে কোরিয়ান অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আশিক মাহমুদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সভায় নেপালের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সম্মেলনে বিনিয়োগ এসেছে ৩ হাজার ১০০ কোটি : বিডা আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২৫-এ দুটি প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে বলে জানান বিডার বাণিজ্য উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রচি। তিনি বলেন, বিনিয়োগ সম্মেলনে ছয়টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে মোট দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭১০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, যেখানে বিদেশি-প্রবাসী প্রতিনিধি ছিলেন ৪১৫ জন। চার দিনে মোট প্যানেলিস্ট বক্তা ছিলেন ১৩০ জন।
সংবাদ সম্মেলনে চৌধুরী আশিক মাহমুদ সম্মেলনের খরচের বিষয়ে জানান, এ সম্মেলন আয়োজনে সরকারের খরচ হয়েছে ৫ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে সরকারের খরচ হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বাকি টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ (এফআইসিসিআই) কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো বিদেশিদের মনোভাবে পরিবর্তন আনা। আমরা সেটা করতে পেরেছি। কারণ আমাদের অনেকেই জানিয়েছে গুগল সার্চের বাংলাদেশ আর সরাসরি দেখা বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তিনি বলেন, আমাদের এখন দুটি কাজ। একটি সংস্কার এবং পাশাপাশি একটি পাইপলাইন তৈরি করা। যাতে যারা এখান থেকে ঘুরে গেলেন তাদের বিনিয়োগ যে একটা কাঠামোতে আসে। এর জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো একটি ওয়েবসাইট করা, যেখানে একজন বিনিয়োগকারী প্রবেশ করলে যত দপ্তরের কাজ রয়েছে, সবগুলোর বিষয়ে নির্দেশনা পাবেন কোনটার পর কোনটা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় সব দপ্তর বা মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করবে। বিভিন্ন এজেন্সি যখন একই ছাতার নিচে একসঙ্গে কাজ করবে, তখন বিনিয়োগকারীকে আর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যেসব প্রতিনিধি সম্মেলনে এসেছিলেন, তারা দুটি বিষয় গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেছেন। তার একটি সরাসরি বাংলাদেশে না এলে এর আসল চেহারা জানা যাবে না। সবাই এটাকে দক্ষিণের একটি দেশ হিসেবে গড় বিবেচনায় নেবে। এই ইতিবাচক ধারণাটা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় হলো যারা বিনিয়োগ করতে আগে যোগাযোগ করেছেন, তারা এতটাই স্ট্রাগল করেছেন যে, শুরুটা কোথা থেকে করবেন সেটাই একটা কঠিন বিষয়। এর মধ্যে হয়তো পরিবেশ, গ্যাসের অনুমোদন পেতেই বছর দুই চলে গেছে।
তিনি জানান, যেসব প্রবাসী বিভিন্ন দেশে রয়েছেন তাদের মাধ্যমে দেশে কোনো বিনিয়োগ আসলে পরামর্শক ফি হিসেবে কোনো প্রণোদনা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে আলোচনা হয়েছে। এখন রেমিট্যান্স যারা পাঠান তাদের ২.৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়।
