দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে ‘বাংলাদেশ’। একটি প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বল্পতম সময়ের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে এ দেশের মানুষ লড়তে সাহস দেখিয়েছে তাদের অভূতপূর্ব দেশপ্রেমের জন্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও প্রত্যেক অঞ্চলের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে মুক্তিবাহিনী সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছেন দেশের মানুষের কাছ থেকে। কেউ অস্ত্র দিয়ে, কেউ অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিবহন করে, কেউ পথপ্রদর্শক হিসেবে, কেউ রসদ পরিবহন করে, কেউ শত্রুর তথ্য সরবরাহ করে, কেউ আহতদের লুকিয়ে রেখে, চিকিৎসাসেবা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা জনমানুষের খুব কাছাকাছি আসার কারণেই বা জনমানুষের মধ্য থেকেই মুক্তিবাহিনী গঠনের কারণে অন্যদেরও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার, রণাঙ্গনের যোদ্ধা হওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছার জন্ম হয়। বিশেষ করে, কিশোর-তরুণদের। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বা শরণার্থী শিবিরে যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক মানুষদের খোঁজ করা হতো তখন বয়সে ছোট হওয়ার কারণে কিশোর ও তরুণরা সে তালিকার অংশ হতে পারতেন না। কিন্তু তাদের উপর্যুপরি অনুরোধ ও ইচ্ছার কাছে পরাজিত হয়ে প্রশিক্ষণ শিবিরে আনা হলেও রণাঙ্গনের যুদ্ধে অংশগ্রহণের বাধা থেকেই যেত। কিন্তু এই অসমসাহসী ও দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কিশোরদের নিরস্ত্র করা যেত না কিছুতেই। ক্যাম্প অধিনায়ক ও দলীয় কমান্ডাররা অনুমতি দিতে এক প্রকার বাধ্য হতেন তাদের বারবার অনুরোধের কারণে। প্রতিটি যুদ্ধে তারা যে সাহসিকতা ও বীরত্বের মাইলফলক স্থাপন করেছেন তার তুলনা হয় না। দলের অন্য সদস্যদের জীবন বাঁচাতে এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও পিছ পা হননি তারা। তাদের বীরত্ব অন্যদের পথ দেখিয়েছে, তার জীবন উৎসর্গ অন্যদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। সঙ্গীর মৃত্যুর বদলা নিতে জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা দুর্বার আক্রমণ করে রণক্ষেত্রে জয় ছিনিয়ে এনেছেন।
দুঃখের ব্যাপার হলো, মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক লিখিত ইতিহাসে এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এসব শহীদ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ও রণাঙ্গন থেকে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসা কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। সে কারণেই বয়সে ছোট কাজে বড় এসব কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও অবদান সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্ম প্রায় কিছুই জানে না। তারা চলে গেছেন জনসাধারণের অলক্ষ্যে, হয়ে গেছেন বিস্মৃত। মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক কাজী সাজ্জাদ আলী জহির তার ‘বাংলার কিশোর মুক্তিযোদ্ধা’ বইয়ে তেমন কয়েকজন বিস্মৃতপ্রায় বীর কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা তুলে ধরেছেন।
এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় কারও বয়সই বিশ ছাড়ায়নি। অর্থাৎ তারা সবাই প্রায় ‘টিএজ’ বয়সী। ভাবতে অবাক লাগে, এই বয়সী একটি কিশোর যার কি না বই-খাতা আর খেলাধুলার সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, শুধু দেশের কথা ভেবে এবং ২৫ মার্চ কালরাতে দেশের মানুষকে অতর্কিতে মেরে ফেলার খবর জেনে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে কেউ দলের অন্যদের বাঁচাতে স্বেচ্ছায় একা প্রতিরোধ করেছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোটা একটি দলকে, কেউ একাই এগিয়ে গিয়েছেন ব্রিজ উড়িয়ে দিতে, কেউ প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, কেউ গোটা বাহিনীকে পালাতে সাহায্য করতে পারলেও নিজে পড়েছেন ধরা। কিন্তু ধরা পড়ার পরও তাদের অটুট মনোবল এতটুকু চিড় ধরেনি। তারা অবর্ণনীয় অত্যাচারের মুখেও মুখ খোলেননি, বলেননি সঙ্গীদের নাম, মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরের হদিস। তথ্য না দেওয়ায় হাসান আলী কপালে স্টেনগান ধরা হয়। হাসান আলী মাটিতে সেজদা দিয়ে, মাটিকে চুমু খেয়ে বলেন, আমি প্রস্তুত। পাকিস্তানি সেনা তার বুকে গুলি করলে তিনি শহীদ হন। সঙ্গীর নাম না বলায় সালাহউদ্দিনকে হাত বেঁধে ফেলে দেওয়া হয় বাঘের খাঁচায়। শহীদ হওয়ার আগেই শিরাজুল বাবাকে লিখেছিলেন, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে... দোয়া করবেন মৃত্যু হইলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখবেন লাখ লাখ ছেলে বাংলা বুকে পুত্র হারাকে বাবা বলে ডাকবে। সেই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন। দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য বাজারের মাঝে গারো মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দ্রংকে অত্যাচার করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। বইটি পড়লে তোমরা জানবে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক, মহসীন, জাকির হোসেন, আবদুস সালাম, আবদুস সাত্তার, মেহেরুন্নেসা মিরা, লাল মোহাম্মদ লালু আর বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কথা।
কিশোর বয়সেই তারা যে দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তার তুলনায় তুমি কী করতে পারো? হ্যাঁ, তোমারও আছে অনেক কিছু করার। দেশ যখন আক্রান্ত হয় তখন দেশকে রক্ষা করাই হলো দেশপ্রেম। আর স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জন্য কর্তব্য কী? একজন দার্শনিক বলেছিলেন, নিজের কাজটি সৎভাবে করাই হলো দেশপ্রেম। ভালো করে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করাই হলো একজন শিক্ষার্থীর দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। আর কর্মক্ষেত্রে নিজের কাজটি সঠিকভাবে করাই হলো নাগরিকের দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। বইটি নিঃসন্দেহে সৎভাবে জীবনযাপনে তোমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। সুলতানা রাজিয়া
