ডিম-মুরগির বাজার অস্থির করার পাঁয়তারা!

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:১৯ এএম

বিভিন্ন সময় ডিম-মুরগির বাজার অস্থিরতার কারণে ভুগেছে ভোক্তারা। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশের ডিম-মুরগির বাজার ব্যাপক অস্থির ছিল। তৎকালীন সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও তাদেরই আশকারায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণ হয়নি। ওই সময় বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) নামে একটি সংগঠন বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে মাঠে নামে। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, একে অন্যকে দোষারোপ করে কাজ শেষ।

প্রশ্ন উঠেছে, বিপিএ কী ধরনের সংগঠন? এ সংগঠনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার। যার না আছে নিজস্ব কোনো পোলট্রি খামার। না আছে তার সংগঠনের কোনো নিবন্ধন। এখন অভিযোগ উঠেছে, স্থিতিশীল থাকা ডিম-মুরগির বাজারকে অস্থির করে তুলতে পাঁয়তারা করছেন তিনি।

গত ১৭ এপ্রিল সাংবাদিকদের কাছে এক বিজ্ঞপ্তি পাঠান তিনি। বিজ্ঞপ্তিতে ১০ দফা দবি ঘোষণা করে তা বাস্তবায়ন না হলে আগামী ১ মে থেকে সারা দেশে সব পোলট্রি খামার বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সংগঠনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদারের মতে, গত দুই মাসে সারা দেশের খামারিরা ‘আনুমানিক’ ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছে ডিম-মুরগি বিক্রিতে। অথচ কয়েক মাস ধরেই বাজারে ডিম-মুরগির দামে স্থিতিশীলতা রয়েছে। ভোক্তারাও রয়েছেন স্বস্তিতে।

গত দুই মাসে দেশের খামারিরা ‘আনুমানিক’ ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছে তার ভিত্তি কী? এ ব্যাপারে সুমন হাওলাদার অবশ্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, “আমি ‘গবেষণা’ করে খামারিদের লোকসানের এই তথ্য বের করেছি।”

সুমন হাওলাদার গবেষণার কথা বললেও আসলে তার কোনো গবেষণা টিম নেই বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘খামারিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে আমি এই হিসাব করেছি।’

সুমন হাওলাদারের হিসাবে উদাহারণ দেওয়া যাক, তিনি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষাণা দেন, করপোরেটদের মাধ্যমে পোলট্রি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চে ঘোষণা দেন, ৫২ দিনে ৯৩৬ কোটি টাকা লোপাট। ওই বছর আগস্টে ঘোষণা দেন, ৫ হাজার ৯২০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর ২০ দিনে ২৮০ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য দিয়েছেন। যার সবই তার মনগড়া বলে অভিযোগ রয়েছে।

সারা দেশে পোলট্রি খামার বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণার ব্যাপারে এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামার বন্ধের সক্ষমতা বিপিএর নেই এবং তার কোনো সুযোগও নেই। তবে বাজারে ডিম-মুরগির দামের যে স্থিতিশীলতা, সেটা নষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল এই ঘোষণায়। যে কারণে দ্রুত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গত ২১ তারিখ বিপিএর সভাপতিসহ ৮-৯ জন সদস্যের সঙ্গে মিটিং করেন। সেখানে তাদের দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে সেদিনই খামার বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন বিপিএর এই নেতা।

যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় বিপিএর সভাপতি সুমন হাওলাদারের শুধু নাজিফা পোলট্রি ফিড অ্যান্ড মেডিসিনের দোকান রয়েছে। তার কোনো খামার নেই। অথচ তিনি দেশের খামারিদের প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে দাবি করেন।

জানা গেছে, খামারিদের এ সংগঠনটির এখনো পর্যন্ত কোনো নিবন্ধন নেই। কতজন সদস্য তা কেউ জানে না, যদিও সংগঠনের সভাপতি সুমন হাওলাদার দাবি করেছেন, তাদের এখন ১৮ হাজার খামারি সদস্য রয়েছে। যদিও দেশের এখন সব মিলে খামারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। তিনি দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, তার কথায় সবাই খামার বন্ধের জন্য প্রস্তুত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালের শেষদিক থেকেই বিপিএ একটি-দুটি করে সংবাদ সম্মেলন করতে শুরু করে। সংবাদ সম্মেলনের প্রধান এজেন্ডাই থাকত করপোরেট কোম্পানিগুলো পোলট্রি খাত থেকে কত টাকা লোপাট করে নিল। মনগড়া এই হিসাবে এ তথ্য প্রদান করার মধ্য দিয়ে সুমন সারা দেশে পরিচিতি পেতে থাকেন।

জানা গেছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ডিম ও মুরগির দামে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। যে অস্থিরতা সরকার কোনোভাবেই কমাতে পারছিল না। তখন সরকার সুমন হাওলাদারকে কাজে লাগায়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ভোক্তা অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজকর্মে। তারা অস্থিরতার সময়ে সুমন হাওলাদারকে দিয়ে কম দামে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ডিম বিক্রি শুরু করে। আর তার এ ধরনের ন্যায্যমূল্যের দোকান উদ্বোধনে সবসময় পাশে থাকতেন তৎকালীন ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান।

পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪-এর নির্বাচনের আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালযের মন্ত্রী ছিলেন শ ম রেজাউল করিম। তিনি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাগে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় সুমন হাওলাদারকে তৈরি করেছিলেন, যাতে তাদের চাপে রাখা সম্ভব হয়। ভোক্তার সাবেক মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান শুধু সুমন হাওলাদার নয়, গরুর মাংসের বাজার ঠিক করার জন্য খলিলকে দিয়ে ৬০০, ৬৫০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, বাজার তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। একসময় বাধ্য হয়েই খলিল কম দামে মাংস বিক্রি বন্ধ করে দেন, কারণ তার লোকসান দিন দিন বাড়ছিল। তবে এ চরিত্রগুলো এখন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

এ চিত্রকে অনেকেই বলছেন, এটা এক ধরনের স্ট্যান্ডবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি, সাপ্লাই চেইন ঠিক না করে কোনোভাবেই দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

জানা গেছে, সুমন হাওলাদারের এ সংগঠনের নির্বাহী কমিটিতে কারা কারা আছেন তা কেউ জানেন না। তিনি সবসময় দুই থেকে তিনজন সঙ্গী নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। একসময় নারায়ণগঞ্জে ভ্যানে করে মুরগি ও ডিম বিক্রি করতেন। তবে এখন তার মূল বিজনেসই হলো খামারিদের নাম ভাঙিয়ে স্ট্যান্ডবাজি করে যাওয়া। কারণ তিনি যখন প্রথম দিকে সংবাদ সম্মেলন করতেন বিপিএর নামে, তখন তার ব্যানারে লেখা থাকত ‘ডিলার-খামারিদের’ সংগঠন। যদিও এটা পরে পরিবর্তন করেছেন।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একবার তরমুজের বাড়তি দাম নিয়ে নানা সমালোচনা তৈরি হলে ঢাকার কয়েকটি স্থানে ন্যায্যমূল্যে তরমুজও বিক্রি করেছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে এই সুমন হাওলাদার অবশ্য নিজ এলাকায় পোস্টার ছাপিয়ে শেখ হাসিনার নৌকাকে বিজয়ী করার জন্য এলাকাবাসীকে অনুরোধও করেছিলেন।

পোলট্রি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কো-অর্ডিনেশন কমিটি (বিপিআইসিসি) দাবি করছে, পোলট্রি খাতে প্রান্তিক খামারিদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান বড় বিনিয়োগ করেছে। এ বিনিয়োগ ও শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত করতেই সুমন হাওলাদারের মতো চরিত্র তৈরি করা হয়েছে, যা শিল্পের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এজন্য এ শিল্প সুরক্ষায় সুমন হাওলাদারের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয় অনুসন্ধান, বিপিএর আইনি বৈধতা, সরকারের ভাবমূর্তি হুমকিতে ফেলার বিষয়গুলো তদন্ত করা উচিত। বিপিআইসিসি দ্রুতই তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে।

পোলট্রি খাতের পরিচিত সংগঠনগুলোর একটি ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন। এর সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিপিএর কাজকর্ম এবং কথাবার্তা পুরোপুরি উদ্ভট। এ ধরনের চরিত্র শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। তার বিষয়ে সরকারের অনুসন্ধান করা উচিত। কারণ এ শিল্পে দেশি-বিদেশি ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। শিল্প খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানে যারা রয়েছে তারা নিয়মিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে উৎপাদন খরচ, লাভ-লোকসানের হিসাব দিয়ে যাচ্ছে। তারপরও প্রতিনিয়ত বিপিএ করপোরেটদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যা মোটেও ইতিবাচক কোনো ফল বয়ে আনবে না।

তবে সুমন হাওলাদারের উত্থানের পেছনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ বাজারে যখন ডিম-মুরগির দামে অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন মিডিয়ার কাছে তথ্য প্রদানে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়িমসি করে। এ সুযোগে মিডিয়া সব ধরনের কমেন্টস নেয় সুমন হাওলাদারের কাছ থেকে।

সুমন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে জানান, তার সংগঠনে এখন ১৮ হাজার মেম্বার। খামারিরাই তাকে বলেছেন খামার বন্ধের ডাক দিতে। তিনি খামার বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় এখন খামারিরা তাকে নানাভাবে অপদস্থ করছে।

তিনি স্বীকার করেন, ২০২০ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও তার সংগঠনের এখনো কোনো নিবন্ধন নেই। সবশেষ তার যে দোকানটি ছিল যাত্রাবাড়ীতে, তাও দুই মাস আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার কোনো খামার আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

জানা গেছে, বর্তমানে পোলট্রি খাতে এক লাখের মতো ছোট-বড় খামার রয়েছে। যেখানে সরাসরি ২৫ লাখ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করছে। প্রতিদিন পোলট্রি খাত থেকে ৪-৪.৫ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হয়। পোলট্রি খাতটি শুধু ডিম-মুরগির উৎপাদন নয়, বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি মিলিয়েই। এ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রতি বছর পোলট্রি খাত থেকে ১১ লাখ টন মুরগির মাংস উৎপাদন হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত